মাছের খামারে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত ক্ষতি কমাতে বড় ধরনের অগ্রগতির খবর দিয়েছেন গবেষকেরা। তারা এমন একটি মুখে খাওয়ানো টিকা তৈরি করেছেন, যা মাছের খাবারের সঙ্গে সহজেই মিশিয়ে খাওয়ানো যায়। বিশেষ করে সদ্য জন্ম নেওয়া মাছের লার্ভা ও ছোট আকারের পোনা, যাদের ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেওয়া কঠিন, তাদের সুরক্ষায় এই পদ্ধতিকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষকদের আশা, এই নতুন টিকা মাছের মৃত্যুহার কমানোর পাশাপাশি খামারের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ছোট মাছই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণকারী একটি ভাইরাস লার্ভা ও অল্পবয়সী মাছের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। সংক্রমণের পর এই পর্যায়ের মাছের মৃত্যুহার প্রায় শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যারা বেঁচে যায়, তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং উৎপাদনও কমে যায়।
বড় আকারের মাছ তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকলেও ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বহুবার শনাক্ত হয়েছে এবং এটি জলজ চাষ শিল্পের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।

কীভাবে কাজ করে নতুন টিকা
নতুন টিকার দুটি প্রধান অংশ রয়েছে। প্রথমটি ভাইরাসের বাইরের আবরণ অনুকরণ করে তৈরি বিশেষ কণা, যার মধ্যে ভাইরাসের জিনগত উপাদান নেই। ফলে এটি রোগ সৃষ্টি করতে পারে না, কিন্তু মাছের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভাইরাস চিনতে শেখায়।
দ্বিতীয় অংশটি হলো একটি নিরাপদ বাহক, যা এই কণাগুলোকে মাছের পাকস্থলীর অম্লীয় পরিবেশ থেকে রক্ষা করে অন্ত্রে পৌঁছে দেয়। সেখান থেকে এগুলো রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সহায়তা করে।
ফলে ভবিষ্যতে প্রকৃত ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে মাছের দেহ দ্রুত তা শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
গবেষণায় মিলেছে ইতিবাচক ফল
গবেষণায় দেখা গেছে, এই মুখে খাওয়ানো টিকা ব্যবহার করলে প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সংক্রমণের সাত দিন পর মাছের মস্তিষ্কে ভাইরাসের পরিমাণ প্রায় ৩০০ গুণ পর্যন্ত কমে আসে।

পরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, এক ধরনের চাষযোগ্য মাছের ক্ষেত্রে টিকা দেওয়া মাছের বেঁচে থাকার হার ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে টিকা না পাওয়া মাছের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ।
তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইনজেকশনের টিকার তুলনায় এই পদ্ধতির কার্যকারিতা কিছুটা কম এবং একই ফল পেতে তুলনামূলক বেশি মাত্রার টিকা প্রয়োজন হতে পারে।
বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তুতি
গবেষণা দল ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির জন্য একাধিক পেটেন্টের আবেদন করেছে। এখন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাস্তব পরিবেশে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া মাছের আরেকটি প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগের বিরুদ্ধেও একই ধরনের মুখে খাওয়ানো টিকা তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সফল হলে জলজ চাষ শিল্পে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে গবেষকদের আশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















