শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে লাগাম টানতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির সরকার ঘোষণা করেছে, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য চালু থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ব্যর্থ হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ জরিমানা দ্বিগুণ করা হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ক্ষমতা দেওয়া হবে, যাতে তারা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সরাসরি তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে।
সরকারের এই পদক্ষেপ এমন সময় এলো, যখন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কয়েক মাস পরও বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরী আগের মতোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে।
নিয়ম ভাঙলে বাড়বে আর্থিক শাস্তি
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আইন মানতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করা হবে। সরকারের লক্ষ্য, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা।

সরকার জানিয়েছে, অনলাইন নিরাপত্তা তদারকি সংস্থা বর্তমানে কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইন মেনে চলার বিষয়টি তদন্ত করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা বাড়ছে
নতুন আইনের আওতায় অনলাইন নিরাপত্তা কমিশনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাধ্যতামূলকভাবে তথ্য চাইতে পারবেন। তারা কীভাবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের নতুন হিসাব খোলা ঠেকাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও প্রমাণও দিতে হবে।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নয়, বয়স যাচাই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অ্যাপ বিতরণসংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা সহজ হবে।
সরকারের দাবি, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট করছে না
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিশুদের নিরাপদ রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যূনতম বয়সসীমা চালুর পর আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে অনেক শিশু এখনো সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আইন কার্যকর হওয়ার পর ১৬ বছরের কম বয়সীদের ৫০ লাখের বেশি হিসাব বন্ধ অথবা সীমিত করা হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর চালু করা বয়স যাচাই ব্যবস্থা সহজেই ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের প্রকৃত বয়স যাচাইয়ের কোনো কার্যকর প্রমাণই চাওয়া হয়নি।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার তিন মাস পরও ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয়দের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই নিজের বয়স ১৬ বছরের বেশি দেখিয়ে অথবা নিজের ছবি ব্যবহার করে যাচাই প্রক্রিয়া পার হয়ে গেছে।
আইন আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি
সরকারের যোগাযোগবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের বদলে ন্যূনতম পদক্ষেপ নিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। এ কারণে আইনের কার্যকারিতা বাড়াতে আরও সংশোধনী আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সরকার জানিয়েছে, সংশোধিত আইন কবে সংসদে উপস্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।

এদিকে, একটি জনপ্রিয় অনলাইন আলোচনা প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে এই নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছে। সরকার জানিয়েছে, তারা আদালতে আইনটির পক্ষে অবস্থান নেবে।
অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগ বিশ্বের অনেক দেশের নজর কেড়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশ একই ধরনের আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















