কিশোর ছেলেরা একই বয়সী মেয়েদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক পরিবারের মধ্যে এখনও এমন ধারণা প্রচলিত যে ছেলেদের আচরণ সংশোধনে তুলনামূলক কঠোর শাসনের প্রয়োজন। গবেষকরা বলছেন, এই বিশ্বাসই শারীরিক শাস্তির প্রবণতাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকিয়ে রাখছে।
গবেষণাটি ১৩ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। এতে ৫৪২টি মা-সন্তান জুটির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকদের মতে, কৈশোর এমন একটি সময়, যখন শিশুদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত ঘটে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজের স্বাধীন পরিচয় গড়ে তুলতে শুরু করে। এই সময়ে শারীরিক শাস্তি তাদের আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শাস্তির ধরন ও পরিসংখ্যান
গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে ৫৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি পেয়েছে। এর মধ্যে লাঠি, বেল্ট বা অন্য কোনো শক্ত বস্তু দিয়ে হাত বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার ঘটনাও রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রায় ৪৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী তুলনামূলকভাবে গুরুতর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ঘুষি মারা, মুখে চড় দেওয়া বা জোরে চিমটি কাটার মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ছেলেদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাবাদের পক্ষ থেকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার হার মেয়েদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
শাস্তির পর কিশোরদের অনুভূতি
শারীরিক শাস্তি পাওয়ার পর কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে দুটি অনুভূতি দেখা গেছে, তা হলো রাগ এবং মানসিক কষ্ট।
প্রায় অর্ধেক কিশোর-কিশোরী জানিয়েছে, শাস্তি দেওয়ার সময় তাদের বাবা-মা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। আবার এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি বলেছে, শাস্তি দেওয়ার পর তাদের বাবা-মা অনুশোচনা বা অপরাধবোধে ভুগেছেন।
গবেষকদের মতে, শিশুদের এই নেতিবাচক অনুভূতি বাবা-মায়ের সঙ্গে বিশ্বাস ও সম্পর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কেন টিকে থাকে এই প্রবণতা

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মা ছোটবেলায় নিজেরাও শারীরিক শাস্তি পেয়েছিলেন, তারা সবাই একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন না। বরং বিষয়টি নির্ভর করে তারা সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী ধরনের বিশ্বাস গড়ে তুলেছেন তার ওপর।
যেসব মা মনে করেন শারীরিক শাস্তি না দিলে সন্তান বখে যাবে, পড়াশোনায় মনোযোগী হবে না বা এটি সন্তান লালন-পালনের স্বাভাবিক অংশ, তাদের মধ্যে শারীরিক শাস্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, তাই শুধু শাস্তি বন্ধ করার আহ্বান জানালেই হবে না। বাবা-মায়ের মধ্যে যে বিশ্বাস ও মানসিক ধারণা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে, তা পরিবর্তনের পাশাপাশি বিকল্প ইতিবাচক শাসন-পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি।
আয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া যায়নি
গবেষণায় বিভিন্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে শারীরিক শাস্তির হার বা মাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের ভাষ্য, অনেকেই মনে করেন নিম্ন আয়ের পরিবারে শারীরিক শাস্তি বেশি হয়। কিন্তু এই গবেষণার ফল বলছে, আর্থিক চাপের চেয়ে সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও পারিবারিক মূল্যবোধই এখানে বেশি প্রভাব ফেলে।

ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘কঠোর শাসন’-এর সামাজিক ধারণা
গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক পরিবারে এখনও বিশ্বাস করা হয় ছেলেরা শারীরিকভাবে বেশি শক্ত, তাই তাদের কঠোরভাবে শাসন করা উচিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল ও শক্ত চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চাপ থেকেও অনেক বাবা-মা দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় শারীরিক শাস্তির পথ বেছে নেন।
তবে গবেষকদের সতর্কবার্তা, বারবার শারীরিক শাস্তি পেলে শিশুদের মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা বা বিরোধ মেটানোর জন্য বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য। দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক আচরণ এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কৈশোরে ইতিবাচক যোগাযোগ, ধৈর্য এবং বিকল্প শাসন-পদ্ধতির চর্চা শিশুদের সুস্থ বিকাশে অনেক বেশি কার্যকর বলে গবেষণায় গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এশিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণায় কৈশোরে শারীরিক শাস্তির সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবারে শাস্তির পরিবর্তে বোঝাপড়া, ইতিবাচক দিকনির্দেশনা এবং সম্মানজনক যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















