ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ আপাতত থেমেছে। কিন্তু এই বিরতিকে স্থায়ী শান্তির সূচনা বলে ধরে নেওয়া ভুল হতে পারে। বরং পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামরিক সংঘর্ষের বদলে রাজনৈতিক সময়সূচি, জ্বালানি বাজার এবং অর্থনৈতিক চাপই আগামী সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে গেলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত সময়ের আলোচনার উদ্যোগ চলছে। এই আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, অবিশ্বাসের ভিত্তি এখনো অটুট। তবু বাজারের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন আবার স্বাভাবিক হওয়া। যুদ্ধ চলাকালে কার্যত অচল হয়ে পড়া এই নৌপথ সচল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থানের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
কিন্তু এই স্থিতি কতদিন থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই স্পষ্ট ছিল, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনীতির পাশাপাশি তেলের দামও সংঘাতের অন্যতম নিয়ামক হবে। বাস্তবে সেটিই ঘটেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এমনকি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের একাধিক দাবি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা কাজ করেছে বলে মনে হয়।
এই সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচন পর্যন্ত জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রয়োজনও। কারণ যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমত ইতিবাচক ছিল না, আর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম নিয়ে প্রশাসনের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোলের দাম কিছুটা কমায় প্রশাসন স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর। যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরানকে হয়তো হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধও করতে হবে না। কেবল বাজারে এমন ধারণা তৈরি করাই যথেষ্ট হতে পারে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ আবার ঝুঁকির মুখে। সেই আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন ব্যয়, সার, শিল্পের কাঁচামাল এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। নির্বাচনের বছরে এই সম্ভাবনাই তেহরানের হাতে একটি কার্যকর কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এখন পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ছোটখাটো উত্তেজনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু বাজারের এই আত্মবিশ্বাস খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে, যদি মনে হয় ইরান আবারও হরমুজকে রাজনৈতিক চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
![]()
তবে নভেম্বরের পর পুরো হিসাবই পাল্টে যেতে পারে।
যদি রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে আসন হারায়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আরও বিভক্ত ও প্রতিকূল আইনসভা মোকাবিলা করতে হতে পারে। বাজেট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করানো কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় প্রেসিডেন্টরা অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা থেকে দৃষ্টি সরাতে বৈদেশিক নীতিতে আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন, যেখানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম।
বর্তমানে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার নতুন যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী নন বলেই মনে হয়। কিন্তু ইরানের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার কারণে তিনি দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে তেলের বাজারও দ্রুত রাজনৈতিক ঝুঁকি ভুলে যেতে পারে—এই বাস্তবতা ভবিষ্যতে সামরিক চাপ প্রয়োগকে রাজনৈতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের বর্তমান সুবিধাজনক অবস্থানও স্থায়ী নয়। শরতের মধ্যে যদি পারমাণবিক কর্মসূচিসহ মূল বিরোধগুলোর সমাধান না হয়, তাহলে আলোচনার পথ আবারও অচল হয়ে যেতে পারে। আর দুই পক্ষের অবস্থান বিবেচনায় এমন সম্ভাবনা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
এই বাস্তবতায় ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো অবিরাম যুদ্ধ নয়, বরং এমন এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, যেখানে সংঘাতের সম্ভাবনা সবসময় বিদ্যমান থাকবে এবং বিশ্ববাজার নিয়মিতভাবে তার মূল্য দেবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে ইউরোপ ও এশিয়ার বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো। তেল ও গ্যাসের সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও তাদের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
তাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।
ইউরোপ ইতোমধ্যেই সেই পথেই এগোতে শুরু করেছে। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে একাধিক জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতার পর অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ তেল-গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—বহির্ভরতা কমানো।
অবশ্য এই পরিবর্তনের ফলে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। কিন্তু সেই নির্ভরতার প্রকৃতি ভিন্ন। তেল বা গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা তাৎক্ষণিক সংকটে পড়ে। বিপরীতে সৌর প্যানেল বা বায়ু টারবাইনের নতুন সরবরাহ ব্যাহত হলেও ইতোমধ্যে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু থাকে। কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধের একটি অধ্যায় হয়তো আপাতত শেষ হয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এখনো শেষ হয়নি। বরং সামনে এমন এক সময় আসতে পারে, যখন সামরিক সংঘর্ষের চেয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই বিশ্বকে আরও গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। সেই বাস্তবতার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
জোয়াকিম ক্লেমেন্ট 


















