দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপ অভিযান প্রত্যাশার অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় হতাশা স্বাভাবিক। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতার দায় কার? কেবল কোচের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি মাঠের বাইরের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে তাকাতে হবে?
বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে আরও ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে দলসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগও আগের তুলনায় বেশি ছিল। মেক্সিকোর বিপক্ষে তাদের মাটিতে হারকে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অন্তত একটি ড্রও নিশ্চিত করতে না পারা হতাশাকে আরও গভীর করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন প্রধান কোচ হং মিয়ং-বো। এটি দ্বিতীয়বারের মতো তাঁর অধীনে দক্ষিণ কোরিয়া গ্রুপ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হলো। তাঁর নেতৃত্ব, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বিস্তর। তবে ঘটনাটি কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়াই এখন বড় বিতর্কের বিষয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়াই কি মূল সমস্যা?
হং মিয়ং-বোকে কীভাবে জাতীয় দলের কোচ করা হয়েছিল, তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও সামাজিক মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যেই কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিদায়ী সভাপতি চুং মং-গ্যুর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় দল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরপরই তদন্তের ঘোষণা আসে, যখন জনমত ইতোমধ্যে ক্ষোভে উত্তাল।
এতে কোচ ও ফুটবল কর্মকর্তারা জনরোষের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক মহলও দ্রুত এই ক্ষোভের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে নেয়। ফলে হং মিয়ং-বো আর শুধু ব্যর্থ কোচ নন; তিনি যেন গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সাফল্য এলে কি গল্পটা ভিন্ন হতো?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি ভাগ্য কিছুটা সহায় হতো, অন্য ম্যাচগুলোর ফল দক্ষিণ কোরিয়ার অনুকূলে যেত, তারা অল্পের জন্য দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যেত, এরপর একের পর এক নাটকীয় জয় পেয়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যেত—তাহলে কি আজকের আলোচনাও একই থাকত?
সম্ভবত না।
তখন হয়তো একই নিয়োগকে দূরদর্শী নেতৃত্বের উদাহরণ বলা হতো। ২০১৪ সালের ব্যর্থতাকে শেখার অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। দুই বছরের মধ্যে দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য হং মিয়ং-বো প্রশংসিত হতেন। কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সংস্কারের দাবি অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যেত। এমনকি যাঁরা আজ তদন্ত চাইছেন, তাঁরাই হয়তো সফলতার জন্য সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানাতেন।
এই সম্ভাব্য চিত্রটি দেখায়, ক্রীড়াজগতে ফলাফল প্রায়ই মানুষের বিচারকে প্রভাবিত করে। একই সিদ্ধান্ত সাফল্যের সময় প্রশংসিত হয়, আবার ব্যর্থতার পর সেটিই হয়ে ওঠে অপরাধের প্রতীক।
ফলাফল নয়, প্রতিষ্ঠানই হওয়া উচিত বিচার্যের কেন্দ্র
অবশ্য বাস্তবতা কল্পনার মতো নয়। দক্ষিণ কোরিয়া বিদায় নিয়েছে, কোচ পদত্যাগ করেছেন এবং জনসমালোচনার মুখে পড়েছেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে ফলাফলের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন কোচকে শেষ পর্যন্ত ফল দিয়েই মূল্যায়ন করা হয়।
কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। যদি সত্যিই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রশ্ন বিশ্বকাপের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে না। দল প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ুক কিংবা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হোক—আইন ও জবাবদিহির মানদণ্ড একই থাকা উচিত।
সমস্যা হলো, নিয়োগ নিয়ে যে অভিযোগ বহু আগেই উঠেছিল, তা তখন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আগের হস্তক্ষেপও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে পারেনি। অথচ এখন, ব্যর্থতার পর হঠাৎ করে সবাই একই সুরে সংস্কারের কথা বলছে। এতে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহির চেয়ে জনরোষই তদন্তের গতি নির্ধারণ করছে।
বিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগ
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপ ব্যর্থতা তাই কেবল একটি ফুটবল ফলাফল নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই সংকট যদি ফুটবল প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কারের পথ খুলে দেয়, তাহলে হতাশার মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত শুধু জয় দেখতে চান না; তাঁরা এমন একটি ব্যবস্থাও দেখতে চান, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ন্যায্যতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। যদি সেই ভিত্তি শক্তিশালী করা যায়, তাহলে চার বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে দক্ষিণ কোরিয়া হয়তো শুধু ভালো ফুটবলই খেলবে না, নিজেদের ফুটবল ব্যবস্থার প্রতিও নতুন করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে।
স্কট শেফার্ড 



















