ভারতের গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা গ্রামীণ কর্মসংস্থানের পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন নামে ও নতুন কাঠামোয় একটি কর্মসূচি চালু হয়েছে। সরকার বলছে, এতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে এবং কর্মদিবসও বাড়বে। তবে বিরোধী দল, অর্থনীতিবিদ ও অধিকারকর্মীদের একটি বড় অংশের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে দরিদ্র মানুষের কাজের আইনি নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে পড়বে।
কর্মদিবস বাড়লেও বদলে গেছে কাঠামো
নতুন কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ পরিবারগুলো বছরে ১০০ দিনের পরিবর্তে ১২৫ দিন পর্যন্ত কাজের সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়েছে। তবে আগের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের পরিবর্তে এখন তুলনামূলক সীমিত সংখ্যক উৎপাদনশীল অবকাঠামো নির্মাণকাজে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকারের ভাষ্য, অতীতে অনেক প্রকল্প বাস্তবিক অর্থে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই এবার এমন কাজ বেছে নেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

সমালোচনার কেন্দ্রে অর্থায়নের নতুন পদ্ধতি
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে অর্থায়নের নতুন কাঠামো নিয়ে। আগে গ্রামীণ শ্রমিকদের মজুরির পুরো ব্যয় বহন করত কেন্দ্রীয় সরকার। এখন প্রতিটি রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করা হবে। সেই বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে অতিরিক্ত ব্যয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে বহন করতে হবে।
সমালোচকদের মতে, এর ফলে কাজের আইনি অধিকার বাস্তবে সীমিত বাজেটনির্ভর কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে। অর্থসংকটে থাকা অনেক রাজ্য প্রতিশ্রুত কর্মদিবস দিতে সক্ষম হবে না বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত
নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কয়েকটি রাজ্য সরকার আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নতুন কর্মসূচি বাতিলের আহ্বান জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই পরিবর্তন গ্রামীণ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে।
পুরোনো প্রকল্পের দুর্বলতাও ছিল
তবে আগের কর্মসূচিও সমস্যামুক্ত ছিল না। অনেক এলাকায় অর্থের অভাব বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শ্রমিকরা প্রতিশ্রুত কাজ পাননি। যাদের বেকার ভাতা পাওয়ার কথা ছিল, তাদের বড় অংশ সেই অর্থও পাননি। মজুরি পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্ব এবং দুর্নীতির অভিযোগও ছিল নিয়মিত।
সরকারের দাবি, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব দুর্বলতা কাটিয়ে আরও ফলপ্রসূ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
নতুন ব্যবস্থায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা
অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, নতুন কাঠামো পুরোনো সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতি এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
তাদের মতে, এ বছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দ অনুযায়ী কয়েকটি রাজ্যে প্রতিশ্রুত ১২৫ দিনের পরিবর্তে তার অনেক কম দিনের কাজ দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি
বছরের পর বছর ধরে এই কর্মসূচি শুধু দরিদ্র মানুষের আয়ের নিরাপত্তাই দেয়নি, বরং অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছে। বিশেষ করে মহামারির সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ এই কর্মসূচির ওপর নির্ভর করেছিলেন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে, সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে এবং বেসরকারি খাতেও মজুরি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে।
কঠিন সময়ে বড় পরীক্ষা
বর্তমানে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি নানা চাপে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি সীমিত, জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে এবং দুর্বল বর্ষাও কৃষিকে চাপে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসূচি যদি প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তা শুধু গ্রামীণ মানুষের জন্য নয়, সরকারের জন্যও বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















