ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি রাশিয়াকে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করার লক্ষ্য নিয়ে ৪০ দিনের একটি নতুন ড্রোন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণাকে ঘিরে যেমন রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রেও এর বাস্তব প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যদিও ইউক্রেনের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সুর স্পষ্ট, বাস্তব পরিস্থিতি এখনো জটিল এবং যুদ্ধের ফল নির্ধারণের মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ৪০ দিনের সময়সীমা শুধু সামরিক পরিকল্পনা নয়, বরং রাশিয়ার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলও।
ড্রোন হামলায় বদলাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি স্থাপনা, তেল শোধনাগার এবং সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে কয়েকটি অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং কিছু এলাকায় রেশনিংয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে ক্রিমিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক, সেতু, রেলপথ ও ফেরি রুটেও হামলা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সেখানে অবস্থানরত রুশ বাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। মাঝারি পাল্লার ড্রোন ব্যবহারের এই কৌশল বর্তমানে যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর শুরু অভিযান
এই ধরনের অভিযান একদিনে শুরু হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষ ইউনিট গঠন, নতুন কৌশল তৈরি এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক উন্নত ড্রোন সংগ্রহের পর চলতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে এটি পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়।
ইউক্রেনের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা বিপুলসংখ্যক রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। এতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে এবং ক্রিমিয়ার দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে চাপ বেড়েছে।
ক্রিমিয়া এখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়
তবে ক্রিমিয়াকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা এখনো সম্ভব হয়নি। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, মূল লক্ষ্য দ্রুত বিজয় নয়; বরং সেখানে অবস্থানরত রুশ বাহিনীর কার্যক্রমকে কঠিন করে তোলা।
ধারণা করা হচ্ছে, রুশ বাহিনীর হাতে এখনো কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে। ফলে তারা সমস্যায় পড়লেও পরিস্থিতি এখনো তাদের জন্য সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি।

ডনবাসে রাশিয়ার চাপ অব্যাহত
অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের ডনবাসে পরিস্থিতি ইউক্রেনের জন্য কঠিনই রয়ে গেছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং বিস্তৃত সড়ক নেটওয়ার্কের কারণে সেখানে ড্রোন অভিযান তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর।
কোস্তিয়ান্তিনিভকা, ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কের আশপাশে তীব্র লড়াই চলছে। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, জনবল ও গোলাবারুদের দিক থেকে রাশিয়া এখনো এগিয়ে রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্দেশিত বোমা ব্যবহার করছে রুশ বাহিনী, যার সমপরিমাণ জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ইউক্রেনের নেই।
আগস্টের আলোচনার আগে কৌশলগত চাপ
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, জেলেনস্কির ঘোষিত ৪০ দিনের সময়সীমার লক্ষ্য মূলত সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আগে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো। আশা করা হচ্ছে, ক্রিমিয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বিঘ্ন ঘটাতে পারলে মস্কো আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেবে।

তবে যদি সেই লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তাহলে যুদ্ধ শীতকাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার নতুন হামলার আশঙ্কাও রয়েছে।
তথ্যযুদ্ধেও সক্রিয় ইউক্রেন
সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি তথ্যযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে ইউক্রেন। শক্ত অবস্থানের বার্তা দিয়ে দেশের জনগণের মনোবল ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থকদের কাছে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরাই এই কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের সামরিক অগ্রগতি বাস্তব হলেও সেটিকে আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এই প্রচারণাও যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ জনমত ও আন্তর্জাতিক সমর্থন বর্তমান সংঘাতের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















