দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর রহস্য উন্মোচনের পথে বড় সাফল্য এসেছে। বহুদিন ধরে কয়লার টুকরোর মতো দেখতে যে পোড়া স্ক্রলগুলো পড়া অসম্ভব বলে মনে করা হতো, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলোর লেখা এখন ধীরে ধীরে উদ্ধার করা যাচ্ছে। গবেষকদের আশা, এই অগ্রগতি প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আনতে পারে।
ধ্বংসস্তূপে লুকিয়ে ছিল বিশাল গ্রন্থভান্ডার
খ্রিস্টাব্দ ৭৯ সালে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ইতালির প্রাচীন নগরী হারকুলেনিয়ামকে ধ্বংস করে দেয়। সেই সময় একটি অভিজাত ভিলার বিশাল গ্রন্থাগারও আগ্নেয় ছাই ও তাপের নিচে চাপা পড়ে। সেখানে সংরক্ষিত ছিল প্রায় ৬০০ থেকে এক হাজার প্যাপিরাস স্ক্রল।
১৭৫০ সালে এলাকাটি পুনরাবিষ্কারের পর থেকেই বিশ্বের বহু গবেষক এসব স্ক্রল পড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এগুলো খুলতে গেলেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অতীতে নানা রাসায়নিক ও তাপ ব্যবহার করেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়নি।

প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন সাফল্য
সম্প্রতি গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অত্যাধুনিক কণা স্ক্যানিং প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ স্ক্রল ভার্চুয়ালভাবে খুলে তার লেখা পড়া সম্ভব হয়েছে। প্রায় দেড় মিটার দীর্ঘ ওই স্ক্রলের প্রতিটি অংশ ডিজিটালভাবে বিশ্লেষণ করে লেখা শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এখনও বন্ধ অবস্থায় থাকা প্রায় ৪০০টি স্ক্রলও যদি একইভাবে পড়া সম্ভব হয়, তাহলে প্রাচীন সাহিত্য থেকে প্রায় ৩০ লাখ নতুন শব্দ উদ্ধার হতে পারে। এতে হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানভান্ডারের বিশাল একটি অংশ আবারও বিশ্বের সামনে ফিরে আসতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীন বিশ্বের বিপুল সাহিত্য ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, সেই সময়ের মোট সাহিত্যের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ আজ পর্যন্ত টিকে আছে। লাতিন ভাষার ক্ষেত্রে সেই হার আরও কম।
এ কারণে নতুন কোনো প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার শুধু নতুন লেখা পাওয়ার বিষয় নয়, বরং ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝারও সুযোগ তৈরি করে। অতীতের বহু ধারণা নতুন তথ্যের আলোকে বদলে যেতে পারে।

নতুন লেখা, কিন্তু প্রত্যাশার সীমাও আছে
এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া প্রতিটি লেখাই আগে অজানা ছিল। এতে গবেষকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। তবে অনেকের আশা ছিল হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাত কবিতা, নাটক বা ঐতিহাসিক গ্রন্থের সন্ধান মিলবে। এখন পর্যন্ত সেই সম্ভাবনার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বরং উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ লেখাই প্রাচীন গ্রিক দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনপ্রিয় কল্পনার মতো নাটকীয় পরিবর্তন নাও আনতে পারে।
সামনে আরও বড় সম্ভাবনা
হারকুলেনিয়ামের যে ভিলায় এই গ্রন্থাগার ছিল, তার বড় একটি অংশ এখনও খনন করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে আরও স্ক্রল বা নতুন সংগ্রহের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি যেমন নতুন পথ খুলে দিয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের প্রত্নতাত্ত্বিক খননও এই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রযুক্তি ও প্রত্নতত্ত্বের এই সমন্বয় হয়তো আগামী দিনে প্রাচীন বিশ্বের আরও অজানা অধ্যায় উন্মোচন করবে।
ভিসুভিয়াসের আগুনে পুড়ে যাওয়া এই নীরব পাণ্ডুলিপিগুলো তাই আবারও কথা বলতে শুরু করেছে। আর সেই কণ্ঠস্বর ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















