কালো পোশাক পরা শোকাহতদের অনেকের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা এবং খামেনি ও তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতিকৃতি। শোকানুষ্ঠানজুড়ে ধর্মীয় আবেগ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য এবং বিপ্লবী চেতনার প্রকাশ ছিল স্পষ্ট।
শ্রদ্ধা নিবেদনে জনস্রোত
জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতা ও বিদেশি অতিথিদের জন্য একদিনের রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শনিবার খামেনির কফিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তাঁর সঙ্গে একই স্থানে রাখা হয়েছে তাঁর মেয়ে, জামাতা, পুত্রবধূ এবং ১৪ মাস বয়সী নাতনির কফিনও।
তবে একই হামলায় আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হলেও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এবং তাঁর কোনো নতুন ছবি প্রকাশ করা হয়নি।
মোসাল্লার বিশাল প্রাঙ্গণে শোকাহত মানুষ বুক চাপড়াতে, বিলাপ করতে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতাকা নাড়াতে দেখা যায়। প্রচণ্ড গরমে অনেক নারী কালো চাদরের সঙ্গে সাদা সানভাইজার বা ছাতা ব্যবহার করেন।
অনুষ্ঠান পরিচালকের আহ্বানে শোকধ্বনি ওঠে, আর প্রার্থনাস্থলে বারবার ধ্বনিত হয় “আমেরিকার মৃত্যু হোক” স্লোগান।
৪০ বছর বয়সী আরাশ রহিমি নামের এক শোকাহত রয়টার্সকে বলেন, “আমরা আমাদের সর্বোচ্চ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতেই এখানে এসেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রক্তের বৈরিতা রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক কখনোই ভালো হবে না।”
যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইরানের কর্তৃপক্ষ বলছে, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে এবং এটিকে তারা একটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের অংশ হিসেবে দেখছে।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, শেষকৃত্য ঘিরে এক সপ্তাহের জন্য শান্তি আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরানের শীর্ষ নেতারা সবাই এক জায়গায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্যবস্তু করেনি, কারণ তাহলে আলোচনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকত না। তিনি আরও বলেন, খামেনির শেষকৃত্যে মানুষের কান্না দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন এবং মন্তব্য করেন, “হয়তো এগুলো ভুয়া কান্না।”
এর জবাবে আর্মেনিয়ায় ইরানের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় জানায়, “আপনি এসব বিষয় বোঝেন না, কারণ আপনার নেই সভ্যতা, ইতিহাস কিংবা সম্মান।”
যুদ্ধের ক্ষতি ও জনমতের প্রশ্ন
প্রায় ৯ কোটি মানুষের ইরানে সরকারপন্থী জনসমর্থনের প্রকৃত চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল এবং কঠোর দমন-পীড়নে হাজারো মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রকাশ্যে তেমন কোনো সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।

যুদ্ধে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারাও রয়েছেন। বহু সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং এতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান
ইসলামী রীতিতে সাধারণত মৃত্যুর এক দিনের মধ্যেই দাফন সম্পন্ন হয়। তবে যুদ্ধ চলাকালে বড় জনসমাগমের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে খামেনির দাফন বিলম্বিত করা হয় এবং যুদ্ধবিরতির পর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি শুরু হয়।
রবিবার পর্যন্ত তেহরানে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ থাকবে। সোমবার রাজধানীতে বৃহৎ শোকযাত্রার পর মরদেহ নেওয়া হবে কোম শহরে। এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে মাশহাদে সমাহিত করা হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ আগামী কয়েক দিনের শোকযাত্রায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবহন, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থাও করেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















