পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার গত দেড় বছরে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ শুরু করেছিল। তবে মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যাশিত সুফল না দিয়ে উল্টো অনেক কৃষকের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে, অনেক মেশিন অকেজো হয়ে পড়েছে এবং বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক জায়গায় মেশিন চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে সরকারি ও কৃষক—উভয় পক্ষের কয়েক দশ কোটি টাকার বিনিয়োগ এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি মাঠে বিতরণ করা হয়েছে।
প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ, মাঠে মিলছে না সুফল
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে আরও ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন দেওয়া হয়।

প্রতিটি মেশিন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২৭ হাজার টাকা এবং কৃষকদের বহন করতে হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং কৃষকদের অংশসহ মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রশিক্ষণে কৃষকদের জানানো হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পেঁয়াজ ৯ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে এবং প্রতিটি মেশিন ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কিন্তু বাস্তবে বহু এলাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে পেঁয়াজ পচনের ঝুঁকি
কৃষকদের অভিযোগ, গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সংরক্ষিত পেঁয়াজে দ্রুত পচন ধরে।
মেহেরপুরের মুজিবনগরে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনেক কৃষকের সংরক্ষিত পেঁয়াজ নষ্ট হতে শুরু করে। ভবেরপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আউয়াল জানান, ভালো দামের আশায় সংরক্ষণ করা পেঁয়াজ এখন প্রতিদিনই পচে যাচ্ছে।
একই উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কৃষক ও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণে শেখানো নিয়ম অনুসরণ করেও তাঁর কয়েকশ মণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি কার্যকর সমাধান পাননি।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীব মৃধার মতে, নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা অনেকাংশে ব্যবহার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সমস্যা, তাপমাত্রা এবং রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণের কারণেও পচন দেখা দিতে পারে।

ফরিদপুরেও একই সংকট
ফরিদপুরে চলতি অর্থবছরে রেকর্ড ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। জেলায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৪৩০টি এয়ার-ফ্লো মেশিন বিতরণের পাশাপাশি চলতি বছর আরও ৭০০টি মেশিন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থায় একই ধরনের সমস্যার অভিযোগ উঠেছে।
সালথা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় সংরক্ষিত পেঁয়াজ প্রতিদিনই নষ্ট হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকায় এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, এয়ার-ফ্লো মেশিন কার্যকর রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। বিদ্যুৎ না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, ভাবছে সরকার
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, কৃষকের হাতে নতুন প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার আগে দেশের বাস্তব অবকাঠামোগত পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের মধ্যে বিদ্যুৎনির্ভর সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিতরণ পরিকল্পনার দুর্বলতারই পরিচয়। তাঁর মতে, প্রতিটি মেশিনের সঙ্গে সোলার প্যানেল সংযুক্ত করা হলে বিদ্যুৎ না থাকলেও বাতাস চলাচল অব্যাহত থাকত এবং পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব রায়হান কাওছারও বলেছেন, প্রকল্পের সঙ্গে সোলার ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে সোলার সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















