দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকায় উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ছুটে আসছেন অভিভাবকরা। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়েও অনেক শিশুর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ঢাকাকেই শেষ ভরসা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন তারা। তবে রাজধানীতে এসে বেডসংকটের কারণে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাতশোর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬ হাজারেরও বেশি রোগী। গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতিদিনই জ্বর, র্যাশ, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে শিশুদের রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হচ্ছে।
রাজধানীর শিশু হাসপাতালে বেডসংকট
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা গেছে, হামের জন্য নির্ধারিত সব ওয়ার্ড রোগীতে পূর্ণ। কোনো বেড খালি না থাকায় অনেক রোগীকেই অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে।

হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা জানান, গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও আক্রান্ত রোগীর প্রবাহ এখনো কমেনি। ফলে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হাসপাতালকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
জেলা থেকে ঢাকায় ছুটে আসছেন অভিভাবকরা
কুমিল্লা থেকে সন্তানকে নিয়ে আসা এক অভিভাবক জানান, স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শেই তারা ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু শিশু হাসপাতালে কোনো সিট না পাওয়ায় অন্য হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
বরিশাল থেকে আসা আরেক অভিভাবক জানান, প্রথমে তার শিশুর টাইফয়েড ধরা পড়ে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকায় এনে অনেক কষ্টে একটি বেড পাওয়া গেছে। বর্তমানে শিশুটিকে অক্সিজেন, স্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ধামরাই থেকে আসা আরেক পরিবারের শিশুর প্রথমে ঠান্ডা ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চলছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা হামের লক্ষণ শনাক্ত করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। একইভাবে মানিকগঞ্জ থেকে আসা এক শিশুর হামের উপসর্গ অনেকটাই কমলেও এখনো শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা চলছে।
আইসিইউ থেকে ফিরেও চলছে চিকিৎসা
এক অভিভাবক জানান, তার পাঁচ মাস বয়সী সন্তানকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটি ১২ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা নেওয়ার পর সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে অবস্থার উন্নতি হলেও শ্বাসকষ্ট পুরোপুরি কাটেনি।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হামের উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিচ্ছে। ফলে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
রোগী কমেনি, খালি নেই কোনো বেড
হাসপাতালের দায়িত্বরত নার্সরা জানান, গুরুতর রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও প্রতিদিন নতুন রোগী আসছে। ফলে কোনো বেডই খালি রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
নার্স সুপারভাইজারের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল পর্যন্ত হাসপাতালে ৮৯ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিলেন এবং একটি বেডও খালি ছিল না। সপ্তাহের অন্য দিনের তুলনায় শুক্রবার রোগীর চাপ কিছুটা কম থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
ডেঙ্গুর চাপ এখনো সীমিত
হামের বিপরীতে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ তুলনামূলক কম রয়েছে। শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা সীমিত থাকায় চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে মাত্র আটজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, হামের পাশাপাশি যদি ডেঙ্গুর রোগীও একই হারে বাড়তে শুরু করে, তাহলে হাসপাতালের ওপর চাপ আরও বেড়ে যাবে।
দেশজুড়ে হামের বিস্তার অব্যাহত থাকায় রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো এখনো আক্রান্ত শিশুদের প্রধান ভরসা হয়ে আছে। তবে রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে বেড, চিকিৎসা-সুবিধা এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















