চীনে উচ্চ চাহিদার কারণে গত কয়েক বছরে মালয়েশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল কৃষিপণ্য রপ্তানিতে পরিণত হয়েছিল দুরিয়ান। বিশেষ করে প্রিমিয়াম জাত ‘মুসাং কিং’-এর জনপ্রিয়তা দেশটির কৃষকদের বড় বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছিল। তবে চলতি মৌসুমে সেই সাফল্যই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে খুচরা বাজারে দুরিয়ানের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
দেশটির ফেডারেল এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং অথরিটি (ফামা) জানিয়েছে, উৎপাদন বৃদ্ধির গতি অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজারের শোষণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষক পর্যায়ে দাম কমে যাওয়া ছিল প্রায় অনিবার্য।
উৎপাদন বেড়েছে যেভাবে
পাহাং অঙ্গরাজ্যের দুরিয়ান চাষি জোসেফ ফুং জানান, কয়েক বছর আগে দুরিয়ান শিল্পে যে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছিল, তার ফল এখন দেখা যাচ্ছে। তখন লাগানো হাজার হাজার প্রিমিয়াম গাছ একসঙ্গে বাণিজ্যিক উৎপাদনে এসেছে।
এর পাশাপাশি এল নিনো-সংশ্লিষ্ট গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া প্রায় একই সময়ে গাছে ফুল আসতে সহায়তা করেছে। সাধারণত বিভিন্ন সময়ে ফুল এলেও এবার অধিকাংশ গাছে একযোগে ফুল এসেছে, ফলে ফলনের পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে।
তবে চাষিদের মতে, চলতি বছরের দুরিয়ান স্বাদ ও গুণগত মানের দিক থেকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সেরা। গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ফলের পানির পরিমাণ কম থাকায় মিষ্টত্ব ও স্বাদ আরও ঘন হয়।
দাম কমে ভোক্তাদের স্বস্তি
দাম কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। কুয়ালালামপুরের কাছে পুত্রাজায়ায় আয়োজিত ‘দুরিয়ান ফেস্ট’-এ মুসাং কিং, ব্ল্যাক থর্ন ও রেড প্রনের মতো প্রিমিয়াম জাতের দুরিয়ান কিনতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।
৭২ বছর বয়সী নোরিয়াহ হাশিম জানান, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি সরাসরি মেলায় এসেছেন। আগে একটি মুসাং কিং কিনতেই ৮০ রিঙ্গিতের বেশি খরচ হতো, এখন প্রতি কেজি মাত্র ১৫ রিঙ্গিতে পাওয়া যাচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত ইদ্রিস মোহাম্মদ মাত্র ১০ রিঙ্গিতে পাঁচটি গ্রামীণ জাতের দুরিয়ান কিনেছেন। আরেক ক্রেতা হাফিজ আবদুল্লাহ ৫৩ রিঙ্গিতে আইওআই, ব্ল্যাক থর্ন ও স্থানীয় জাতের দুরিয়ানের একটি ঝুড়ি কিনেছেন, যা আগে কিনতে কয়েক শ রিঙ্গিত লাগত।
বিক্রেতাদের নতুন বাস্তবতা
দাম কমলেও বিক্রেতারা বলছেন, কম দামে বেশি বিক্রি করে তারা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ইজিডুরিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা খাইরুল আনোয়ার মোহাম্মাদিয়াহ বলেন, দুরিয়ান এখন অনেক বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। ফলে ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে, যদিও প্রতিটি বিক্রিতে লাভের পরিমাণ কমেছে।
রপ্তানি চাহিদা এখনও শক্তিশালী
দাম কমার পেছনে চীনের দুর্বল চাহিদাকে দায়ী করা ঠিক নয় বলে জানিয়েছে ফামা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মালয়েশিয়া চীনে ১১ হাজার ৮০৩ মেট্রিক টন দুরিয়ান রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৯ মেট্রিক টন।

২০২৪ সালে তাজা দুরিয়ান রপ্তানির অনুমোদন পাওয়ার পর চীনের বাজারে চাহিদা আরও বেড়েছে। তবে যেসব ফল রপ্তানির মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না, সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
ফামার মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিপণন সক্ষমতা বাড়ানো। নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজা এবং দেশীয় বাজারে দুরিয়ানভিত্তিক নতুন ব্যবসা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চাষি জোসেফ ফুংও মনে করেন, শুধু নতুন গাছ লাগানোই সমাধান নয়। কয়েক বছর আগের বিনিয়োগের ফল এখন একসঙ্গে বাজারে আসছে। তাই ভবিষ্যতে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















