প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া প্রত্যাহার করা হয়েছে—এমন প্রচার সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালেও বাস্তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, মিটার ভাড়া বাতিলের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আবেদন আসেনি এবং কমিশনও এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে সারাদেশে প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের আগের মতোই মাসিক ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে।
প্রিপেইড মিটার ও বর্তমান চার্জ
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের ভাড়া ৪২ টাকা। এর পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ৪২ টাকা হারে ডিমান্ড চার্জও দিতে হয়। ফলে পাঁচ কিলোওয়াট সংযোগধারী একজন গ্রাহককে ডিমান্ড চার্জের সঙ্গে মিটার ভাড়াও বিদ্যুৎ বিলের অংশ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়।
গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, মিটার ভাড়া কাটা বন্ধ হওয়ার কোনো বাস্তব প্রমাণ তারা পাননি। সম্প্রতি রিচার্জ করা একাধিক গ্রাহকের বিলেও আগের মতোই মিটার ভাড়া কাটা হয়েছে।
ডিপিডিসির গ্রাহক নাজিমুল ইসলাম জানান, সামাজিক মাধ্যমে এমন খবর দেখলেও বাস্তবে তিনি কোনো পরিবর্তন দেখেননি। তার আশপাশের সব গ্রাহকই আগের নিয়মে মিটার ভাড়া দিচ্ছেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা আমেনা মুক্তা। তার ভাষায়, মিটার ভাড়া কাটা কখনোই বন্ধ হয়নি।
কীভাবে তৈরি হলো বিভ্রান্তি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের বিষয়টি মূলত একটি গুজব হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পেছনে গত ২৯ মার্চ বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিপেইড মিটার প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই ঋণের অর্থে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মিটার ভাড়া থেকে সেই ঋণের অর্থ পরিশোধ করা হয়। তাই এই ভাড়া বাতিল করতে হলে আগে ঋণ পরিশোধের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টি সমাধান না করেই প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে।

কেন সহজে ভাড়া প্রত্যাহার সম্ভব নয়
বিতরণ কোম্পানিগুলোর মতে, বিদ্যুতের মূল্য, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট একটি নির্ধারিত কাঠামোর অংশ। এর মধ্যে একটি বাদ দিলে সেই অর্থ অন্য কোনো উপায়ে সমন্বয় করতে হবে অথবা সরকারকে সরাসরি আর্থিক দায় নিতে হবে।
হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ লাখ গ্রাহক সবাই সিঙ্গেল ফেজ ব্যবহারকারী হলেও শুধু মিটার ভাড়া থেকেই প্রতি মাসে প্রায় ২২ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা আদায় হয়। এই অর্থ বাতিল করতে হলে সরকারকে সমপরিমাণ অর্থ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দিতে হবে অথবা তাদের ঋণের দায়ভার গ্রহণ করতে হবে।
বিইআরসির অবস্থান
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের বিষয়ে কমিশনের কাছে কোনো আবেদন আসেনি এবং কমিশনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তার ভাষ্য, ২০১৭ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রিপেইড মিটার প্রকল্প চালু হয় এবং সেই প্রজ্ঞাপনের আওতায় মিটার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সরকার চাইলে ওই প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন করে এবং প্রকল্পের আর্থিক দায় গ্রহণের মাধ্যমে মিটার ভাড়া প্রত্যাহার করতে পারে। অর্থাৎ এটি বাস্তবায়নের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















