একই নাম, একই ঐতিহ্য, কিন্তু ভিন্ন বাস্তবতা। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজ—বিশ্বের দুটি অন্যতম প্রভাবশালী উদ্ভাবনকেন্দ্র—এখন প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একদিকে গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্রিটিশ কেমব্রিজের শক্তিশালী অবস্থান, অন্যদিকে সেই গবেষণাকে দ্রুত বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে মার্কিন কেমব্রিজ।
গবেষণার শতবর্ষের ঐতিহ্য
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বমানের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। জীবনবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং চিকিৎসা গবেষণায় শহরটি এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কেমব্রিজে রয়েছে বিশ্বের দুটি শীর্ষ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বায়োটেক, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পাঞ্চল, যেখানে গবেষণার পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠান দ্রুত বিনিয়োগ পায় এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
একই লক্ষ্য, ভিন্ন শক্তি
দুই শহরই বিশ্বমানের উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরি করতে সফল হলেও তাদের শক্তির জায়গা আলাদা। ব্রিটিশ কেমব্রিজ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পেটেন্ট সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মার্কিন কেমব্রিজ বড় বাজার, পর্যাপ্ত মূলধন এবং উন্নত অবকাঠামোর কারণে গবেষণাকে দ্রুত বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে।

ব্রিটিশ কেমব্রিজে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি ও ওষুধ কোম্পানির উপস্থিতি থাকলেও আবাসন, পানি, পরিবহন ও গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে আছে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পর্যাপ্ত গবেষণাগার না পেয়ে বিকল্প জায়গায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেমব্রিজে মহামারির সময় অতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে বিপুল পরিমাণ গবেষণাগার নির্মিত হয়। পরে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে অনেক গবেষণাগার খালি পড়ে থাকে এবং নতুন কোম্পানির জন্য অর্থায়নও কঠিন হয়ে ওঠে।
প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা
এই ভিন্ন বাস্তবতাই দুই কেমব্রিজকে আরও কাছাকাছি এনেছে। এখন অনেক ব্রিটিশ বায়োটেক প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ নিজ দেশে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে অফিস খুলছে, যাতে তারা বড় বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার সুযোগ এবং বিস্তৃত বাজারে প্রবেশ করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগকারীরাও ব্রিটিশ কেমব্রিজে ক্রমেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ব্রিটিশ কেমব্রিজও নিজেদের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিজ্ঞান পার্ক সম্প্রসারণ, নতুন সুপারকম্পিউটার স্থাপন এবং গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি লন্ডন ও অক্সফোর্ডের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে।
নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনের উত্থান
বিশ্ব উদ্ভাবনের মানচিত্রে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে চীন। নতুন ওষুধ উদ্ভাবন এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেশটি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে উদ্ভাবনের কেন্দ্র কেবল দুই কেমব্রিজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী রাখতে দুই শহরের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
দুই কেমব্রিজের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আধুনিক বিশ্বে কেবল গবেষণায় এগিয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; সেই গবেষণাকে সফল ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং বাস্তব প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই কারণেই প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অংশীদারিত্বই এখন তাদের ভবিষ্যতের প্রধান শক্তি হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















