ফ্রান্সের ডানপন্থী রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটানো ৩০ বছর বয়সী জর্ডান বারদেলা এখন দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এমন একটি আদালতের রায়ের ওপর, যা ফ্রান্সের রাজনীতির গতিপথও বদলে দিতে পারে। যদি তার রাজনৈতিক গুরু মেরিন লে পেন আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি না পান, তাহলে বারদেলাই হতে পারেন দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী।
মাত্র এক দশকের রাজনৈতিক জীবনে সাধারণ পরিবারের এক তরুণ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা বারদেলার গল্প এখন ফ্রান্সজুড়ে আলোচনার বিষয়।
সাধারণ পরিবার থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে
প্যারিসের উপকণ্ঠের সাঁ-দেনি এলাকায় বড় হয়েছেন জর্ডান বারদেলা। অভিবাসী অধ্যুষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই এলাকায় বেড়ে ওঠা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বারদেলা নিজেই বলেছেন, কৈশোরে কখনও ভাবেননি যে একদিন তিনি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের একজন হয়ে উঠবেন। লাজুক স্বভাবের এই তরুণের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলেই। ফ্রান্সের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার পড়াশোনা হয়নি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও শেষ করেননি।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর স্থানীয় রাজনীতি থেকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য এবং শেষ পর্যন্ত দলের সভাপতি হওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত।
জনপ্রিয়তার নতুন সমীকরণ
বর্তমানে বারদেলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে প্রবীণ ভোটারদের মধ্যেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের পুরোনো বিতর্কিত ভাবমূর্তির পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত আধুনিক ও পরিশীলিত একটি চেহারা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও তাকে অনেক ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
অভিবাসনই তার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
বারদেলার রাজনৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসন নীতি। তিনি মনে করেন, বর্তমান অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ইউরোপের সাংস্কৃতিক পরিচয় বদলে যাবে।
তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম কঠোর করার পাশাপাশি অভিবাসীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনাকেও তিনি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেছিলেন, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
ইউরোপ ও প্রতিরক্ষা নীতিতে ভিন্ন অবস্থান
বারদেলা ইউরোপীয় সহযোগিতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করলেও তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা আরও বাড়ানোর পক্ষে। তার লক্ষ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এমন একটি কাঠামোয় রূপ দেওয়া, যেখানে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি রাশিয়াকে নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখলেও ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ফ্রান্সের সামরিক অবস্থান নিয়েও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

গুরু মেরিন লে পেনের সঙ্গে সম্পর্ক
বারদেলা ও মেরিন লে পেনের সম্পর্ককে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। লে পেনই তাকে খুব অল্প বয়সে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে তুলে আনেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারদেলা কিছু নীতিগত বিষয়ে নিজের আলাদা অবস্থানও তুলে ধরতে শুরু করেছেন। অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব নীতি এবং অবসর বয়সের মতো কিছু বিষয়ে তার অবস্থান লে পেনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন।
আদালতের রায়ই নির্ধারণ করতে পারে ভবিষ্যৎ
সব নজর এখন আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে। যদি মেরিন লে পেন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ফিরে পান, তাহলে বারদেলাকে আবারও তার ছায়াতেই রাজনীতি করতে হবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তিনিই দলের প্রধান মুখ হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করবেন।
ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বারদেলার উত্থান ইতোমধ্যেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন আদালতের রায়ই ঠিক করে দেবে, তিনি কেবল জনপ্রিয় এক নেতা হিসেবেই থাকবেন, নাকি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান দাবিদার হয়ে উঠবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















