দীর্ঘদিনের মতবিরোধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার পর অবশেষে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনায় একমত হয়েছে জার্মানির ক্ষমতাসীন জোট সরকার। প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করছাড়, পেনশন সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাসহ ৩৪ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকার জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতিকে আবারও গতিশীল করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি একাই জার্মানির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করতে পারবে না, তবে গত এক বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর এটি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মতবিরোধ পেরিয়ে সমঝোতা
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা বিষয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই জোট হয়তো দীর্ঘদিন টিকবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সমঝোতা সেই আশঙ্কা অনেকটাই দূর করেছে।
সরকারের ভাষ্য, জার্মানিকে আবারও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে এবং এখন বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবসা সহজ করতে নতুন উদ্যোগ
সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ব্যবসার পথে থাকা প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। তথ্য সুরক্ষাসহ বিভিন্ন জটিল নিয়ম সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমে।
একই সঙ্গে ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদেশি পণ্যের কারণে দেশীয় শিল্পের যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি শ্রমবাজার আরও নমনীয় করতে নির্দিষ্ট মেয়াদের চাকরির সুযোগ বাড়ানো এবং অসুস্থতার ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
করছাড় ও আয়ের ভারসাম্য
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করছাড় দিতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউরোর তহবিল নির্ধারণ করা হয়েছে। এর একটি অংশ আসবে বছরে আড়াই লাখ ইউরোর বেশি আয় করা ব্যক্তিদের ওপর কর বৃদ্ধি থেকে।
তবে উচ্চ আয়ের আরও বড় পরিসরে কর বাড়ানো কিংবা বিদ্যমান কর-সুবিধা ও ভর্তুকিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব ক্ষমতাসীন জোটের সব অংশের সমর্থন পায়নি। ফলে কর সংস্কার নিয়ে এখনও কিছু অসন্তোষ রয়ে গেছে।
পেনশন ও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের পথে
সরকার আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সংস্কারও এগিয়ে নিতে চায়, যাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা বীমা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে পেনশন ব্যবস্থাকে ঘিরে। দ্রুত বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়া জার্মানিতে ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ধীরে ধীরে অবসরের বয়স ৭০ বছরে উন্নীত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালিত পেনশন তহবিলের অর্থ বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক চাপেই কি বদল?
পর্যবেক্ষকদের মতে, ডানপন্থী জনতাবাদী শক্তির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় সরকার দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি বিতর্কিত বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞ কমিশনের হাতে তুলে দেওয়ায় রাজনৈতিক সমঝোতা সহজ হয়েছে।
তবে সামনে এখনও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। সরকারের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সীমিত হওয়ায় প্রতিটি আইন পাস করানো সহজ হবে না। এছাড়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আসন্ন নির্বাচনও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
তবুও সাম্প্রতিক এই সংস্কার উদ্যোগকে জার্মান সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত এবং কতটা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















