আইনজীবীর বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় মামলা পরিচালনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কম খরচে আইনি পরামর্শ পাওয়ার আশায় অনেকেই এখন বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার দিকে ঝুঁকছেন। তবে এই প্রবণতার সঙ্গে বাড়ছে ভুল তথ্য, ভুয়া নজির এবং অপ্রয়োজনীয় মামলার সংখ্যাও। ফলে আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আদালতে ভুয়া তথ্যের বিস্তার
সম্প্রতি এক রেস্তোরাঁ মালিক কর সংক্রান্ত বিরোধে আদালতে নিজেই নিজের পক্ষে লড়তে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন। কিন্তু তিনি সঠিক নথি জমা দিতে ব্যর্থ হন। শুধু তাই নয়, তার দাখিল করা নথিতে এমন সব আইনি নজির ছিল, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। আদালত শেষ পর্যন্ত মামলাটি খারিজ করে দেয়।
এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বিভিন্ন দেশে আদালতে নিজের পক্ষে লড়া মানুষের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে আদালতে জমা পড়া নথিতে ভুয়া তথ্য ও অস্তিত্বহীন মামলার উদ্ধৃতি আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
মামলা বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে প্রযুক্তি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের মামলা করতে উৎসাহিত করে, আপসে না যেতে পরামর্শ দেয় এবং জয়ের সম্ভাবনাও বাস্তবতার চেয়ে বেশি দেখায়। এর ফলে ছোটখাটো অভিযোগও দীর্ঘ ও জটিল আইনি নথিতে পরিণত হচ্ছে।
নিজের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারীদের ক্ষেত্রে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নথিপত্র আদালতে জমা পড়ছে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হচ্ছে এবং আদালতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ভুলের খেসারত গুনতে হচ্ছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করার মূল্যও কম নয়। সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জে অনিয়মিতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করায় বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু সাধারণ মানুষই নন, অভিজ্ঞ আইনজীবীরাও এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আইনজীবী ও আইন প্রতিষ্ঠান আদালতে ভুল বা মনগড়া আইনি নজির উদ্ধৃত করায় ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে। কোথাও কোথাও জরিমানাও করা হয়েছে।

দায় কার?
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভুল তথ্য তৈরি করলে তার দায় কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানেরও থাকা উচিত? এ নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। একটি বড় প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় ভিত্তিহীন বৈষম্যের অভিযোগ তুলে মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি নির্মাতাদের বক্তব্য, তাদের সেবা কোনো আইনজীবীর বিকল্প নয় এবং ব্যবহারকারীদের নিজ দায়িত্বে তথ্য যাচাই করা উচিত।
মানুষের ভূমিকা এখনো অপরিহার্য
তবে সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নেতিবাচক নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি নথিপত্র প্রস্তুত, তথ্য সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নথি প্রস্তুতের কাজ করেছে, কিন্তু আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং মামলায় সফলতাও এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইনি কাজকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে পারে, কিন্তু আদালতে সঠিক যুক্তি, আইনের ব্যাখ্যা এবং পেশাগত বিচারবোধের বিকল্প এখনো মানুষই। তাই প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে পুরোপুরি তার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















