পশ্চিম বলকান অঞ্চলে জ্বালানি নিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে। রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এই কৌশল ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে ইউরোপের প্রভাব কমিয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন প্রতিযোগিতা
ক্রোয়েশিয়ার ক্র্ক দ্বীপে ২০২১ সালে চালু হওয়া ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনাল এখন ইউরোপে মার্কিন গ্যাস আমদানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মার্কিন গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি আড্রিয়াটিক, বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। একই সময়ে ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার মধ্যে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রকল্পে অগ্রগতি হয়। পাশাপাশি আলবেনিয়ার সঙ্গে কয়েকশ কোটি ডলারের গ্যাস সরবরাহ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

ইউরোপের উদ্বেগ কোথায়
পশ্চিম বলকানের ছয়টি দেশ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। তবে তারা ভবিষ্যতে সদস্যপদ পেতে চায় এবং সে লক্ষ্যেই ইউরোপীয় নীতির সঙ্গে নিজেদের আইন ও বিধি সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে।
ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, রাশিয়ান গ্যাসের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে মার্কিন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে এসব দেশের জন্য ইউরোপীয় জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ ইউরোপ ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে চায়, অথচ যুক্তরাষ্ট্র গ্যাস রপ্তানি আরও বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে।
বিনিয়োগ ঘিরে বিতর্ক
বসনিয়ায় নতুন গ্যাস সংযোগ প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পে হঠাৎ একটি মার্কিন কোম্পানিকে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, যদিও প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেও পরিবর্তন আসে। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রকল্পটি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা ইউরোপীয় নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাশিয়ার প্রভাব কমানোর চেষ্টা
সার্বিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানির বড় অংশীদারিত্ব ছিল দেশটির প্রধান তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠানে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অংশীদারিত্বে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর মেসিডোনিয়াও রাশিয়ান গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। চলতি বছর দেশটি মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য নতুন চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে অঞ্চলজুড়ে রাশিয়ার জ্বালানি প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে।
প্রভাব বিস্তারের নতুন সমীকরণ
রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগকে ইউরোপ ইতিবাচকভাবে দেখলেও পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপ, বিতর্কিত বিনিয়োগ এবং বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে পশ্চিম বলকানে জ্বালানি এখন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
মার্কিন গ্যাস রপ্তানি বাড়ানোর এই কৌশল ভবিষ্যতে পশ্চিম বলকানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















