দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে আরও উন্মুক্ত ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে কিউবা। দেশটির জাতীয় পরিষদ সম্প্রতি ১৭৬টি অর্থনৈতিক সংস্কার অনুমোদন করেছে, যা ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বেসরকারি খাতের জন্য নতুন সুযোগ
অনুমোদিত সংস্কারের আওতায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগে যেসব খাতে ব্যক্তিগত ব্যবসার অনুমতি ছিল না, সেসবের অনেকগুলোই খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উদ্যোক্তারা আরও সহজে আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবেন এবং প্রথমবারের মতো ১০০ জনের বেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার পথও খুলে দেওয়া হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক কাঠামোয় পরিচালনা, শেয়ারভিত্তিক মালিকানা, এমনকি লোকসানের ক্ষেত্রে দেউলিয়া ঘোষণার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে আরও স্বাধীনতা দেওয়া এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে সহজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
সংস্কার পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের রেশনভিত্তিক সার্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য সরাসরি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রম ও কমিউনিটি খাদ্যসেবার মতো কিছু সামাজিক সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকারের মতে, অর্থনীতিকে সচল রাখতে সম্পদ সৃষ্টিকে উৎসাহিত করা জরুরি। সেই কারণে ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ অর্জনের ওপর আগের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও বলা হয়েছে।
কঠিন সংকটে কিউবার অর্থনীতি
গত কয়েক বছরে কিউবার অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ২০২০ সালের পর থেকে দেশের অর্থনীতি ২০ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে।
অনানুষ্ঠানিক বাজারে স্থানীয় মুদ্রার মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ন্যূনতম মজুরির প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। বিদ্যুৎ সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। পানি সরবরাহও নিয়মিত নয়, ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কষ্টকর।

বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ
যদিও সংস্কার পরিকল্পনাকে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবু এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অতীতেও একাধিকবার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি এলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এবারও ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক থেকে যেতে পারে।
আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি মুদ্রার সংকট, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সীমাবদ্ধতা। ফলে নতুন নীতির সুফল দ্রুত পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের আশঙ্কা, বাজারভিত্তিক সংস্কার কার্যকর হলে সমাজে আয় ও সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই কিউবায় ধনী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে নিম্নআয়ের মানুষ নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আরও চাপে পড়তে পারেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই
অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা এলেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী মতের ওপর কঠোর অবস্থান বহাল রয়েছে। ফলে অনেকের ধারণা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উদারতা এখনই আসবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন হলে এই সংস্কার কিউবার অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব প্রয়োগ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















