০১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
জেলার চিকিৎসা ব্যর্থ, ঢাকায় শেষ ভরসা: হামের রোগীতে উপচে পড়ছে শিশু হাসপাতাল প্রিপেইড মিটারের ভাড়া বহাল, প্রত্যাহারের খবর ছিল গুজব দেশের ৯ অঞ্চলে দুপুরের মধ্যে বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি, গ্রামাঞ্চলে বাড়ছে আতঙ্ক জাবিতে র‍্যাগিংয়ের অভিযোগে ইতিহাস বিভাগের ১২ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার ভিসুভিয়াসের আগুনে পুড়ে যাওয়া দুই হাজার বছরের পাণ্ডুলিপি অবশেষে পড়া যাচ্ছে, ইতিহাসে নতুন দিগন্তের আশা আপনার টমেটো সসের বোতলে কেন এখনও রাজত্ব করছে হেইঞ্জ, দেড় শতকের সাফল্যের নেপথ্যের গল্প আমেরিকায় বাড়ছে বারবিকিউর খরচ, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে পরিবারগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভরসায় আইনি লড়াই, বাড়ছে ভুল মামলা ও আদালতের উদ্বেগ তেলের দামে নয়, বাণিজ্যেই বড় লাভ: জ্বালানি সংকটে নতুন শক্তি হয়ে উঠছে ইউরোপের তেল কোম্পানিগুলো

ইতিহাসের অন্ধকার থেকে পর্যটনের আলো, বদলে যাচ্ছে মন্টগোমারি

এক সময় দাসপ্রথা, বর্ণবাদ ও সহিংসতার নির্মম স্মৃতির জন্য পরিচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী মন্টগোমারি। এখন সেই শহরই অতীতের কঠিন ইতিহাসকে সামনে এনে নতুন পরিচয়ে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসকে আড়াল না করে বরং তা সংরক্ষণ ও তুলে ধরার উদ্যোগ শহরটির অর্থনীতি, পর্যটন এবং নগর উন্নয়নে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

ইতিহাসের মুখোমুখি এক শহর

১৮৭৭ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চার হাজার চারশোরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ গণপিটুনি ও বর্ণবাদী সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হন। মন্টগোমারির একটি স্মৃতিসৌধে তাঁদের প্রত্যেকের নাম সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা হাঁটতে হাঁটতে এমন এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যান, যা অতীতের সেই নির্মম বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুভব করায়।

একসময় মন্টগোমারিতে গির্জার চেয়ে দাস বেচাকেনার কেন্দ্র ছিল বেশি। আবার এই শহরই যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় কনফেডারেসির প্রথম রাজধানী ছিল। এখানেই ১৯৫৫ সালে রোজা পার্কস বাসে নিজের আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। পরবর্তীতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই শহর।

Transforming the cradle of the Confederacy

পরিবর্তনের নেপথ্যে দীর্ঘ উদ্যোগ

প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ আজ মন্টগোমারিকে নতুন পরিচয় দিয়েছে। নাগরিক অধিকার, দাসপ্রথা এবং বর্ণবাদী সহিংসতার ইতিহাস তুলে ধরতে একের পর এক স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, ভাস্কর্য উদ্যান এবং জনচত্বর গড়ে তোলা হয়েছে।

শুরুর দিকে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা মন্টগোমারিতে পৌঁছাচ্ছেন।

পর্যটনের সঙ্গে অর্থনীতির উত্থান

ক্রমবর্ধমান পর্যটন চাহিদা মেটাতে নতুন পাঁচতারকা হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং কফিশপ চালু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি বড় অংশ আবার জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ পরিচালনায় ব্যয় করা হচ্ছে।

নতুন হোটেলটির নকশায়ও রয়েছে ব্যতিক্রমী চিন্তা। সেখানে শুধু থাকার ব্যবস্থা নয়, দর্শনার্থীদের আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পাঠাগার, নীরব চিন্তার বাগান এবং বড় আকারের মিলনস্থল রাখা হয়েছে।

Transforming the cradle of the Confederacy

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটনের এই উত্থান শহরের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন পর্যটকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় মন্টগোমারিতে অবস্থান করছেন। গত বছর শহরটিতে ১৪ লাখের বেশি মানুষ ভ্রমণ করেন এবং তাঁদের ব্যয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার যোগ হয়, যা শহরের বার্ষিক বাজেটের কয়েক গুণ বেশি।

নতুন আয়ে বদলে যাচ্ছে শহর

পর্যটনের পাশাপাশি বড় প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের বিনিয়োগও মন্টগোমারির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যবহার করে পরিত্যক্ত ভবন ভেঙে ফেলা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনুদান দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা জোরদার এবং আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।

তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে রাতের খেলাধুলাভিত্তিক কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষের মতে, সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

অতীত স্বীকার করেই ভবিষ্যতের পথে

যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও মন্টগোমারির এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, অতীতের কঠিন সত্যকে অস্বীকার না করে তা সংরক্ষণ করেও একটি শহর নতুনভাবে দাঁড়াতে পারে। এখানকার বার্তা হলো, ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া বিভাজনের নয়, বরং সচেতনতা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ খুলে দিতে পারে।

ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পুনর্গঠনের এই সমন্বয় এখন মন্টগোমারিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত নগর রূপান্তরের উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জেলার চিকিৎসা ব্যর্থ, ঢাকায় শেষ ভরসা: হামের রোগীতে উপচে পড়ছে শিশু হাসপাতাল

ইতিহাসের অন্ধকার থেকে পর্যটনের আলো, বদলে যাচ্ছে মন্টগোমারি

১১:৩৭:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

এক সময় দাসপ্রথা, বর্ণবাদ ও সহিংসতার নির্মম স্মৃতির জন্য পরিচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী মন্টগোমারি। এখন সেই শহরই অতীতের কঠিন ইতিহাসকে সামনে এনে নতুন পরিচয়ে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসকে আড়াল না করে বরং তা সংরক্ষণ ও তুলে ধরার উদ্যোগ শহরটির অর্থনীতি, পর্যটন এবং নগর উন্নয়নে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

ইতিহাসের মুখোমুখি এক শহর

১৮৭৭ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চার হাজার চারশোরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ গণপিটুনি ও বর্ণবাদী সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হন। মন্টগোমারির একটি স্মৃতিসৌধে তাঁদের প্রত্যেকের নাম সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা হাঁটতে হাঁটতে এমন এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যান, যা অতীতের সেই নির্মম বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুভব করায়।

একসময় মন্টগোমারিতে গির্জার চেয়ে দাস বেচাকেনার কেন্দ্র ছিল বেশি। আবার এই শহরই যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় কনফেডারেসির প্রথম রাজধানী ছিল। এখানেই ১৯৫৫ সালে রোজা পার্কস বাসে নিজের আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। পরবর্তীতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই শহর।

Transforming the cradle of the Confederacy

পরিবর্তনের নেপথ্যে দীর্ঘ উদ্যোগ

প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ আজ মন্টগোমারিকে নতুন পরিচয় দিয়েছে। নাগরিক অধিকার, দাসপ্রথা এবং বর্ণবাদী সহিংসতার ইতিহাস তুলে ধরতে একের পর এক স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, ভাস্কর্য উদ্যান এবং জনচত্বর গড়ে তোলা হয়েছে।

শুরুর দিকে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা মন্টগোমারিতে পৌঁছাচ্ছেন।

পর্যটনের সঙ্গে অর্থনীতির উত্থান

ক্রমবর্ধমান পর্যটন চাহিদা মেটাতে নতুন পাঁচতারকা হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং কফিশপ চালু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি বড় অংশ আবার জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধ পরিচালনায় ব্যয় করা হচ্ছে।

নতুন হোটেলটির নকশায়ও রয়েছে ব্যতিক্রমী চিন্তা। সেখানে শুধু থাকার ব্যবস্থা নয়, দর্শনার্থীদের আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পাঠাগার, নীরব চিন্তার বাগান এবং বড় আকারের মিলনস্থল রাখা হয়েছে।

Transforming the cradle of the Confederacy

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটনের এই উত্থান শহরের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন পর্যটকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় মন্টগোমারিতে অবস্থান করছেন। গত বছর শহরটিতে ১৪ লাখের বেশি মানুষ ভ্রমণ করেন এবং তাঁদের ব্যয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার যোগ হয়, যা শহরের বার্ষিক বাজেটের কয়েক গুণ বেশি।

নতুন আয়ে বদলে যাচ্ছে শহর

পর্যটনের পাশাপাশি বড় প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের বিনিয়োগও মন্টগোমারির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যবহার করে পরিত্যক্ত ভবন ভেঙে ফেলা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনুদান দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা জোরদার এবং আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।

তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে রাতের খেলাধুলাভিত্তিক কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষের মতে, সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

অতীত স্বীকার করেই ভবিষ্যতের পথে

যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও মন্টগোমারির এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, অতীতের কঠিন সত্যকে অস্বীকার না করে তা সংরক্ষণ করেও একটি শহর নতুনভাবে দাঁড়াতে পারে। এখানকার বার্তা হলো, ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া বিভাজনের নয়, বরং সচেতনতা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ খুলে দিতে পারে।

ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পুনর্গঠনের এই সমন্বয় এখন মন্টগোমারিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত নগর রূপান্তরের উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।