সোমবার ভোরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে অন্তত আটজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে টানা বর্ষণের মধ্যেই একাধিক জায়গায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টির কারণে রাতের অন্ধকারে হঠাৎ একাধিক জায়গায় মাটি ধসে পড়ে, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোয় বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ি পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠায় প্রতি বর্ষায় কক্সবাজারে পাহাড়ধসের এই ঝুঁকি নতুন করে ফিরে আসে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতির তকমা পাওয়া এই শিবিরগুলোয় প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছেন ২০১৭ সাল থেকে, যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। জায়গার তীব্র সংকটে বন উজাড় করে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে, ফলে মাটির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই ঢালু জমি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন ও সহায়তা সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দেয়, তবু ঘনবসতির কারণে সরিয়ে নেওয়ার কাজ সবসময় পুরোপুরি সফল হয় না, আর প্রতিবছরই কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নতুন করে প্রাণহানির খবর আসে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ বর্ষা মৌসুমে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ মাটির স্তরে পানি জমিয়ে দেয়, আর ঢালে বাঁশ পুঁতে দাঁড় করানো ঘরগুলোর ভিত এমনিতেই দুর্বল থাকায় সামান্য ধাক্কাতেই ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, শরণার্থী শিবিরের অবকাঠামো কতটা ভঙ্গুর জলবায়ু-সংবেদনশীল ঝুঁকির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও অংশীদার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঢালু জমিতে মাটি ধরে রাখার কাঠামো, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও স্থানান্তরের পরিকল্পনায় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে আসছে, কিন্তু তহবিল সংকট বারবার এই কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৌশলীরা বলছেন, ঢালে গাছ লাগিয়ে ও ধাপ কেটে বসতি সাজালে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব, তবে তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও পরিকল্পনা, যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু মানবিক নয়, প্রশাসনিকও। ইতিমধ্যে সীমিত সম্পদে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর দেখভাল করতে হিমশিম খাওয়া স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রতিটি দুর্যোগ বাড়তি চাপ তৈরি করে, আর দাতা দেশগুলোর তহবিল কমতে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্ধার দল ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছেছে এবং আরও ধস হতে পারে এমন স্থান চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে, শুধু চলতি বর্ষা মৌসুমেই একাধিকবার সতর্কবার্তা জারি করে কয়েক হাজার পরিবারকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে, যদিও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
আট বছর পার হয়ে যাওয়া এই শরণার্থী সংকটে প্রতিটি বর্ষা যেন একই প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। কক্সবাজারে পাহাড়ধসে বারবার প্রাণহানির এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, অস্থায়ী বসতিতে মানুষ আর কতদিন প্রকৃতির মুখোমুখি এভাবে ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকবে, যখন প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















