জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো প্রায়ই আমাদের শেখায়, আইন ও নীতিমালা কতটা বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এমন বহু মানুষ আজ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন, যাঁদের একসময় কয়েক মাসের বেশি আয়ু থাকবে বলে মনে করা হতো না। কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলালেও আর্থিক ব্যবস্থার অনেক নিয়ম যেন এখনও অতীতেই আটকে আছে।
আজকের বাস্তবতায় একটি গুরুতর অসুখের নির্ণয় আর মৃত্যুর নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়; বরং এটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার শুরু। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই মানুষকে চিকিৎসা, পরিবার, আয় এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুর হিসাব নতুন করে কষতে হয়। অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়ে নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করাই যদি কঠিন হয়ে পড়ে, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
একজন কর্মজীবী মানুষ সারা জীবন অবসরের কথা ভেবে পেনশন তহবিলে অর্থ জমা রাখেন। ধারণা থাকে, একসময় সেই অর্থ তাঁকে নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পর যদি দেখা যায়, নিজের সেই অর্থ তুলতে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, জটিল নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের বিবেচনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তাহলে পেনশনের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দ্রুত উন্নতির ফলে এখন অনেক ক্যান্সার রোগী লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ বা নতুন ধরনের চিকিৎসার মাধ্যমে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় বেঁচে থাকছেন। কেউ হয়তো কয়েক মাস, কেউ কয়েক বছর, আবার কারও ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ সময় চিকিৎসা কার্যকর থাকতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার এই অগ্রগতি একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন বাস্তবতা—রোগী জানেন না তাঁর সামনে ঠিক কতটা সময় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই আর পূর্ণকালীন চাকরি করতে পারেন না। কেউ শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কর্মজীবন থেকে সরে আসেন, আবার কেউ অবশিষ্ট সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো বা নিজের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো পূরণ করাকেই অগ্রাধিকার দেন। এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং জীবনের শেষ অধ্যায়কে নিজের মতো করে বাঁচার মানবিক আকাঙ্ক্ষা।

সমস্যা হলো, বিদ্যমান পেনশন কাঠামোর অনেক নিয়ম এমন সময়ের জন্য তৈরি হয়েছিল, যখন মরণব্যাধির অর্থ ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যু। কিন্তু এখন সেই ধারণা আর বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। চিকিৎসা যত উন্নত হচ্ছে, রোগীর সম্ভাব্য আয়ুও তত অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে “টার্মিনাল ইলনেস” বা মরণব্যাধির সংজ্ঞা এবং সেই সংজ্ঞার ভিত্তিতে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার নিয়মও নতুন করে ভাবতে হবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, একই রাষ্ট্রের ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মরণব্যাধির ভিন্ন সংজ্ঞা ব্যবহৃত হওয়া। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি মানদণ্ড থাকলেও পেনশন ব্যবস্থায় যদি অন্য মানদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে রোগী ও তাঁর পরিবার অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি ও দুর্ভোগের মুখে পড়ে। নীতিগত সামঞ্জস্যের অভাব শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবনমানের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ নয়, সময়। একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষের শক্তি চিকিৎসা, পরিবার এবং মানসিক স্থিতি রক্ষায় ব্যয় হওয়ার কথা। অথচ তাঁকে যদি নিজের বৈধ সঞ্চয় পাওয়ার জন্য দীর্ঘ আবেদন, কাগজপত্র, অনুমোদন এবং অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তাহলে সেটি কোনোভাবেই মানবিক ব্যবস্থা বলা যায় না।
অবশ্য এই সমস্যার সমাধানও সহজ নয়। পেনশন তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, অপব্যবহার ঠেকানো এবং সবার জন্য ন্যায্য নীতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংস্কারের আগে বিস্তৃত পরামর্শ ও সতর্ক পর্যালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু জটিলতা কখনোই প্রয়োজনীয় পরিবর্তনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে আইন ও নীতিমালাকেও পরিবর্তিত হতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য মানুষের আয়ু বাড়িয়েছে; এখন প্রয়োজন আর্থিক ব্যবস্থাকেও সেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়ে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় লড়াই হওয়া উচিত অসুখের বিরুদ্ধে—নিজের উপার্জিত অর্থ ফিরে পাওয়ার জন্য নয়।
কেটি মার্টিন 



















