মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এবং দূরবর্তী কোয়াসারের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। নতুন এই আবিষ্কার শুধু মহাবিশ্বের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই দিচ্ছে না, বরং বিজ্ঞানীদের সামনে দীর্ঘদিনের এক জটিল মহাজাগতিক রহস্যকে আরও গভীর করে তুলেছে।
নতুন গবেষণায় মোট ৩১টি প্রাচীন কোয়াসার শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে পুরোনো কোয়াসার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এগুলোর আলো পৃথিবীতে পৌঁছেছে এমন এক সময় থেকে, যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র প্রায় ৬৭ কোটি বছর। বর্তমান হিসেবে এটি মহাবিশ্বের মোট বয়সের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ।
কোয়াসার কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
কোয়াসার হলো দূরবর্তী একটি গ্যালাক্সির অত্যন্ত উজ্জ্বল কেন্দ্র, যার শক্তির উৎস একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। কৃষ্ণগহ্বরের দিকে গ্যাস দ্রুত ঘূর্ণায়মান অবস্থায় প্রবেশ করার সময় বিপুল পরিমাণ মহাকর্ষীয় শক্তি বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। ফলে একটি কোয়াসার ট্রিলিয়ন সূর্যের সমান উজ্জ্বলতা নিয়ে জ্বলতে পারে।
এই অসাধারণ উজ্জ্বলতার কারণেই অত্যন্ত দূরের কোয়াসারও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। আর মহাকাশের গভীরে তাকানো মানেই অতীতের দিকে তাকানো। তাই বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের শুরুর দিকের ইতিহাস, গ্যালাক্সির জন্ম এবং অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের বিকাশ সম্পর্কে জানার জন্য বহুদিন ধরেই প্রাচীন কোয়াসারের খোঁজ করছেন।
দুই বছরের পর্যবেক্ষণেই বড় সাফল্য
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইউক্লিড মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এই কোয়াসারগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের একটি স্থিতিশীল অবস্থান থেকে এটি মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করছে।
মাত্র দুই বছরের পর্যবেক্ষণেই ইউক্লিড এতদিন পরিচিত প্রাচীন কোয়াসারের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলেছে। এর আগে ভূমিভিত্তিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এমন অনুসন্ধান চালানো হলেও নতুন এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ প্রযুক্তি গবেষণায় বড় পরিবর্তন এনেছে।

মহাজাগতিক অন্ধকার যুগের শেষের সন্ধান
নতুন আবিষ্কৃত কোয়াসারগুলো এমন একটি সময়ের, যাকে পুনরায় আয়নীকরণ যুগ বলা হয়। এই সময়েই মহাবিশ্বে প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্ম শুরু হয় এবং দীর্ঘ মহাজাগতিক অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে।
গবেষকদের মতে, কোয়াসারগুলো অনেকটা আলোকস্তম্ভের মতো কাজ করে। এগুলোর আলো বিশ্লেষণ করে পৃথিবী ও কোয়াসারের মাঝখানে থাকা গ্যাসের বৈশিষ্ট্য জানা যায়। এর মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হয়, কীভাবে ধাপে ধাপে মহাবিশ্ব আলোয় ভরে উঠেছিল।
আরও গভীর হলো পুরোনো ধাঁধা
নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যেই কীভাবে এত বিশাল ভরের কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হলো, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের এত প্রাথমিক পর্যায়ে বিলিয়ন গুণ সূর্যের ভরের কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু নতুন পর্যবেক্ষণ সেই ধারণাকে বারবার চ্যালেঞ্জ করছে।
এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখন আরও প্রাচীন কোয়াসারের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে আরেকটি শক্তিশালী মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণও চলছে। গবেষকদের আশা, মহাবিশ্বের প্রথম একশ কোটি বছরের কোয়াসারগুলোর ধারাবাহিক ইতিহাস একত্র করতে পারলে এই রহস্যের অনেকটাই উন্মোচিত হবে।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন কোয়াসারের সন্ধান বিজ্ঞানীদের নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়ে গ্যালাক্সি ও অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম কীভাবে ঘটেছিল, তার উত্তর খুঁজতেই এখন আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রস্তুতি চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















