কোনো দেশের মাথাপিছু আয় একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই তাকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জনকে উন্নয়নের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা বড় ধরনের ভুল হতে পারে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় মানুষের জীবনযাত্রা, উৎপাদনশীল অর্থনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বৈষম্য কমানোর সক্ষমতার মাধ্যমে।
ফিলিপাইন সম্প্রতি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। সরকার এটিকে নিজেদের অর্থনৈতিক নীতির সফলতা হিসেবে তুলে ধরছে এবং দাবি করছে, এই স্বীকৃতি আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি অনেক বেশি জটিল। আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন হয়েছে বলে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো রাতারাতি দূর হয়ে যায় না।
এই অর্জনের পেছনে আগের কয়েক বছরের তুলনামূলক উচ্চ প্রবৃদ্ধির অবদান রয়েছে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক গতি আগের মতো শক্তিশালী নয়। একই সময়ে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও প্রত্যাশিতভাবে বাড়ছে না; বরং তা কমছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য অনেক দেশ যখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, তখন ফিলিপাইন সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের নতুন শ্রেণিবিন্যাস মূলত গড় জাতীয় আয়ের হিসাবের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গড় আয় কখনোই সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন নয়। এটি বলে না, আয়ের সুফল কতটা বিস্তৃতভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি দেশের গড় আয় বাড়লেও সেই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী যদি আগের মতোই সীমিত সুযোগ, কম আয় এবং অনিশ্চিত জীবনযাপনের মধ্যে থাকে, তবে উন্নয়নের দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
একই বছরে ভিয়েতনামও উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। তবে দুই দেশের পথ এক নয়। ভিয়েতনাম কয়েক দশক ধরে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করাই ছিল তাদের কৌশল।
ফিলিপাইনের অর্থনীতি এখনও বড় অংশে প্রবাসী আয়, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, অভ্যন্তরীণ ভোগ এবং সেবাখাতের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনশীল শিল্পের বিস্তার সীমিত, বিনিয়োগের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং উৎপাদনশীলতার উন্নতি অসম। ফলে আয়ের পরিসংখ্যান উন্নত হলেও অর্থনীতির ভিত্তি ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
অর্থনৈতিক বৈষম্য এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর খাদ্য, বাসস্থান এবং পরিবহন ব্যয়ের চাপ ক্রমাগত বেড়েছে। অন্যদিকে বহু খাতে প্রকৃত মজুরি উৎপাদনশীলতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে একই অনুপাতে পরিবর্তন করতে পারেনি।
উন্নয়ন অর্থনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—গড় আয়ের চেয়ে আয়ের বণ্টন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন সম্পদ ও আয় অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন জাতীয় গড় সংখ্যাটি সমাজের অধিকাংশ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত করে না। বিপুল জনগোষ্ঠী যদি মোট জাতীয় সম্পদের খুব সামান্য অংশের মালিক হয়, তবে উন্নয়নের সুফলও সীমিত মানুষের মধ্যেই আটকে থাকে।
এই সম্পদ বৈষম্যের প্রভাব অর্থনীতির বহু স্তরে পড়ে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সীমিত হয়, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের সংখ্যা বাড়ে, অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসায়িক সুযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাবেও বৈষম্য গভীর হয়।
ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভোগব্যয় বাড়াতে পারে, কিন্তু সামাজিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। এ কারণেই সরকারি আশাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু মানুষ এখনও নিজেদের দরিদ্র অথবা অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন।
অর্থনৈতিক সাফল্যের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা শুধু প্রবৃদ্ধির হার দেখেন না; তারা আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, স্থিতিশীল নীতি এবং দুর্নীতির মাত্রাও বিবেচনায় নেন। দুর্নীতি বাড়লে বিনিয়োগের প্রকৃত ব্যয়ও বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে অপচয়ের দিকে চলে যায়।
ইতিহাস দেখায়, বহু দেশ মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছেও দীর্ঘ সময় আটকে থেকেছে। কারণ অর্থনীতি বড় হলেও শাসনব্যবস্থা, নীতি ও প্রতিষ্ঠান সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হতে পারেনি। তাই মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও অপরিহার্য।
আধুনিক বিশ্বে ভূরাজনীতিও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব কিছু ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। যদি কৌশলগত জোট একটি দেশের বাণিজ্যিক স্বাধীনতা সীমিত করে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নমনীয়তা কমিয়ে দেয় বা উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতিহাসে যেসব দেশ দ্রুত উন্নত হয়েছে, তারা মূলত শিল্পনীতি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও দেশীয় মূলধন গঠনের ওপর নির্ভর করেছে; সামরিক জোটের ওপর নয়।
নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি আসে উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ থেকে।
উচ্চ-মধ্যম আয়ের স্বীকৃতি তাই কোনো চূড়ান্ত বিজয় নয়; বরং নতুন এক দায়িত্বের সূচনা। আগামী দশকে ফিলিপাইনের সাফল্য নির্ভর করবে তারা উৎপাদনশীল শিল্প কতটা সম্প্রসারণ করতে পারে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা বাড়ায়, বিনিয়োগ পরিবেশ কতটা উন্নত করে, বৈষম্য কতটা কমায় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে তার ওপর।
পরিসংখ্যানগত স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিতে পারে। কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি নির্ধারিত হয় তখনই, যখন সেই অগ্রগতির সুফল সমাজের অধিকাংশ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন হিসেবে প্রতিফলিত হয়। সেই পরীক্ষাই এখন ফিলিপাইনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. ড্যান স্টেইনবক 



















