যুক্তরাজ্যে অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের দেশটিতে নিয়ে আসা নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পরও আগে থেকে থাকা কর্মীদের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নির্ভরশীল (ডিপেনড্যান্ট) সদস্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করছেন বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
দ্য টাইমসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ক্যামেরুনের মাত্র ১২ জন স্বাস্থ্য ও কেয়ার কর্মী তাঁদের সঙ্গে মোট ১৮০ জন পরিবারের সদস্যকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, একজন কর্মীর বিপরীতে গড়ে ১৫ জন নির্ভরশীল দেশটিতে প্রবেশ করেছেন।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে বাংলাদেশের ১৩৯ জন স্বাস্থ্য ও কেয়ার কর্মীর সঙ্গে ৭৪৭ জন পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে গেছেন। অর্থাৎ, একজন কর্মীর বিপরীতে গড়ে পাঁচজনেরও বেশি নির্ভরশীল যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, ঘানার ২৫৭ জন স্বাস্থ্য ও কেয়ার কর্মীর সঙ্গে ২ হাজার ১৩১ জন নির্ভরশীল এবং ভারতের ২ হাজার ৩৯৫ জন কর্মীর সঙ্গে ১০ হাজার ৫০৪ জন পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে গেছেন।
নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেন যাচ্ছে পরিবার
যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৪ সালের মার্চে কেয়ার কর্মীদের নতুন করে পরিবারের সদস্য নিয়ে আসার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। পরে এই নিষেধাজ্ঞা ডিগ্রি-স্তরের নিচের প্রায় সব ধরনের অভিবাসী কর্মীর ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণ করা হয়।
তবে যেসব কেয়ার কর্মী এই বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার আগে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পুরোনো নিয়ম বহাল থাকায় তাঁরা এখনও পরিবারের সদস্যদের স্পন্সর করতে পারছেন। ফলে নতুন বিধিনিষেধ সত্ত্বেও নির্ভরশীলদের আগমন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বিরোধীদের নতুন দাবি
যুক্তরাজ্যের বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি এই পরিসংখ্যানকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেছেন, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত কেয়ার কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন করে পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ বন্ধ করা উচিত।
তাঁর অভিযোগ, কর্মী ভিসাকে ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করছেন, যা অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারি ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
![]()
অন্যান্য দেশগুলোর চিত্র
স্বাস্থ্য ও কেয়ার খাতের বাইরে দক্ষ কর্মী (স্কিলড ওয়ার্কার) ভিসার ক্ষেত্রেও কয়েকটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে নির্ভরশীল সদস্যের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
পাকিস্তানের ১ হাজার ২৯ জন দক্ষ কর্মীর সঙ্গে ৬ হাজার ১৫৫ জন পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে গেছেন, যা প্রতি কর্মীর বিপরীতে প্রায় ছয়জন। নাইজেরিয়ার ২৩০ জন দক্ষ কর্মীর সঙ্গে ১ হাজার ১১৪ জন নির্ভরশীল যুক্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই হার অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে, ফ্রান্সের ১ হাজার ৮০৪ জন দক্ষ কর্মীর সঙ্গে ৭০১ জন পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যে গেছেন, যা প্রতি কর্মীর বিপরীতে গড়ে ০.৪ জন।
অভিবাসন নীতিতে আরও পরিবর্তনের প্রস্তুতি
মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটির গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষ কর্মী ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাওয়া অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। ২০১৯ সালে যাঁরা এই ভিসায় দেশটিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের ৮৫ শতাংশ অন্তত পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেছেন। ২০১৪ সালে এই হার ছিল ৭৪ শতাংশ।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য সরকার স্থায়ীভাবে বসবাসের (সেটেলমেন্ট) যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে ১০ বছরে উন্নীত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থে কাজ, উচ্চ আয়ের পেশা কিংবা সমাজে বিশেষ অবদান রাখার ভিত্তিতে আগেই স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এই নতুন নিয়ম ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রায় ১৬ লাখ অভিবাসীর ওপর প্রয়োগ করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। সরকার কেয়ার কর্মীদের জন্য কিছু অন্তর্বর্তী সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
হোম অফিস জানিয়েছে, নির্ভরশীল সদস্যদের সংখ্যা কমাতে ইতোমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন-দক্ষতার পেশায় পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করা, ভাষাগত শর্ত কঠোর করা এবং বিদেশ থেকে নতুন কেয়ার কর্মী নিয়োগ বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত রয়েছে। সরকারের দাবি, এসব সংস্কারের ফলে গত তিন বছরে যুক্তরাজ্যের মোট নিট অভিবাসন ৮২ শতাংশ কমেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















