গত সপ্তাহের শেষ দিকে উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মিয়ানমার জান্তার বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং আটক সেনা সদস্যরা নিহত হয়েছেন। হামলাগুলো হয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে পুরো মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মংডু, বুথিডং ও পালেতোয়া, এই তিন শহরই এখন আরাকান আর্মির দখলে, যদিও জান্তা মাঝেমধ্যেই আকাশপথে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মংডু টাউনশিপ ও সীমান্ত পুলিশের পঞ্চম ব্যাটালিয়ন সদর দখলের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই আরাকান আর্মি পুরো সীমান্তরেখার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ করে, যদিও তার আগে-পরে উভয় পক্ষের হাতে বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
এই ধরনের হামলা নতুন নয়। চলতি বছরের মার্চে রাখাইনের আন টাউনশিপে আরাকান আর্মি পরিচালিত একটি বন্দিশিবিরে জান্তার বিমান হামলায় ১১৬ জন যুদ্ধবন্দি সেনা নিহত হয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন আরও ৩২ জন। জানুয়ারিতেও চাউং তু গ্রামে একই ধরনের হামলায় ২১ জন বন্দি সেনা ও তাঁদের পরিবারের সদস্য নিহত হন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নিজেদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে জান্তা মূলত সাক্ষী নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ কমে যায়।
এই সহিংসতার প্রভাব শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকছে না। রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একদিকে জান্তার বিমান হামলা, অন্যদিকে আরাকান আর্মির নিজস্ব নিপীড়নের মুখে পড়ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষ উভয় পক্ষের সংঘাতের মাঝে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় ও একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, রাখাইনে সংঘটিত এই ধরনের হামলার জন্য এখনো কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার থাকলেও তদন্ত এগোচ্ছে ধীরগতিতে, আর সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রতিবারই এসব ঘটনা অস্বীকার করছে অথবা প্রতিপক্ষের ওপর দায় চাপাচ্ছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের মার্চ ও জানুয়ারি মাসের দুটি পৃথক হামলাতেই দেড় শতাধিক বন্দি সেনা ও তাঁদের পরিবারের সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, যা প্রমাণ করে জান্তার বিমান হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং যুদ্ধবন্দিদের ওপর নিয়মিত চালানো একটি কৌশল।
বাংলাদেশের জন্য এই সংঘাতের তাৎপর্য সরাসরি। কক্সবাজারে ইতিমধ্যে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন, আর সীমান্তের ওপারে সহিংসতা বাড়লে নতুন করে মানুষ ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় আগেই রাখাইন পরিস্থিতিকে জাতিগত নির্মূলের একটি পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ বলে অভিহিত করেছিল, আর ঢাকার জন্য প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা করে কীভাবে মানবিক সহায়তার দ্বার খোলা রাখা যায়।
আরাকান আর্মি পুরো সীমান্তরেখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দেড় বছর পরও জান্তার আকাশপথে হামলা বন্ধ হয়নি, বরং বন্দিশিবিরগুলোই বারবার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। যতদিন আকাশপথে এই সক্ষমতা বহাল থাকবে, ততদিন সীমান্তের এপার-ওপার দুই দিকেই মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















