ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ চীন বিনিয়োগ সম্পর্কে নতুন গতি এনেছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরে চীন এক শ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পাশাপাশি অবকাঠামো, সীমান্তবর্তী নদীর তথ্য বিনিময় ও এমনকি সামরিক সহযোগিতা নিয়েও সমঝোতা হয়েছে। একই সময়ে ভারত গত রোববার থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা আবার চালু করেছে, প্রায় দুই বছরের স্থগিতাদেশের পর।
সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের শুরু ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বারবার তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে, যদিও তাতে সাড়া মেলেনি। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিজেদের ভিসা স্থগিতাদেশ তুলে নেয়, আর এখন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে দিল্লি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তারই ইঙ্গিত।
বেইজিং সফরে বাংলাদেশ চীন বিনিয়োগ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্প। মংলা বন্দরের কাছে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সমীক্ষা চালানোর বিষয়ে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য একটি সম্ভাব্য সমুদ্রপথের প্রবেশদ্বার হিসেবে তুলে ধরেন, যা দিল্লিতে অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে এটি কোনো একদিকে ঝোঁকার গল্প নয়, বরং কৌশলগত ভারসাম্যের চেষ্টা। বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত, বাণিজ্য-পরিবহন-নিরাপত্তায় প্রতিবেশী দেশটির ওপর নির্ভরতা এখনো ব্যাপক, বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও প্রায় তেরো শ কোটি ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা, বিশেষ করে সীমান্তের কাছে ড্রোন কারখানা তৈরির প্রতিরক্ষা চুক্তি, দিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ভারত-সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক থামেনি, বিএনপি ও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশনির্ভরতার অভিযোগ তুলছে, একদল বলছে অন্যরা ভারতের প্রতি নরম, অন্যদল বলছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে পাকিস্তানের পুরোনো সংযোগ রয়েছে।
আঞ্চলিক সমীকরণে বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী কূটনীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির ভারত ও চীন নিয়ে অবস্থান ভিন্ন হলেও উভয়েই বলছে, প্রতিবেশী সম্পর্কে বাংলাদেশ কারও হাতের ক্রীড়নক হতে চায় না। ক্রিকেট কূটনীতি থেকে শুরু করে সীমান্ত ভিসা নীতি, ছোট ছোট প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় একজন খ্যাতনামা বাংলাদেশি বোলারকে হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপে একটি ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি দল থেকে বাদ দেওয়ার পর ঢাকা পাল্টা ওই লিগের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল, যা দেখিয়ে দেয় ক্রীড়াঙ্গনের ছোট ঘটনাও কীভাবে দুই দেশের সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ চীন বিনিয়োগ সম্পর্ক যত গভীর হবে, ঋণনির্ভরতার ঝুঁকিও ততই বাড়বে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদেরা, আর ঠিক এই ঝুঁকি মাথায় রেখেই ঢাকাকে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে আগামী দিনগুলোয়, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনের পর নতুন সরকার এই দুই সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে ধরে রাখে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















