ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রাকে কেন্দ্র করে তেহরানে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। সরকার এই শোকযাত্রাকে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও, একই সময়ে দেশের অন্য অংশে বিরোধীরা সামাজিক মাধ্যমে খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। ফলে শোক, প্রতিশোধের আহ্বান এবং রাজনৈতিক বিভাজন—সব মিলিয়ে ইরানের বর্তমান বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তেহরানের রেভল্যুশন স্কয়ার থেকে আজাদি স্কয়ার পর্যন্ত খামেনির কফিনবাহী শোভাযাত্রায় মানুষের ঢল নামে। কফিনের সঙ্গে তার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত চার স্বজনের মরদেহও বহন করা হয়। বাসিজ বাহিনীর সদস্যরা কফিনের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন, আর শোকাহত মানুষ ফুল ছুড়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
সরকার দাবি করেছে, শেষযাত্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে বাইরের পর্যবেক্ষকদের হিসাবে উপস্থিতির সংখ্যা কয়েক লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তা সত্ত্বেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২০২০ সালে নিহত কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির জানাজায় অংশ নেওয়া জনসমাগমের তুলনায় বেশি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিশোধের দাবিতে উত্তাল পরিবেশ
শেষযাত্রা ও শোকানুষ্ঠানে অসংখ্য ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রশাসনের অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আহ্বান জানানো হয়। কোথাও লেখা ছিল “ট্রাম্পকে হত্যা করো”, কোথাও “রক্তের বদলে রক্ত”, আবার কোথাও “চোখের বদলে চোখ”।
শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে, তাই প্রতিশোধ দাবি করা তাদের অধিকার। অনেকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার বিরোধিতা করে স্লোগান দেন।
অন্যদিকে বিরোধীদের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
তবে পুরো ইরানের চিত্র এক ছিল না। অনেক মানুষ শোকানুষ্ঠান এড়িয়ে তেহরান ছেড়ে অবকাশযাপনের এলাকায় চলে যান। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সমর্থকদের কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে নাচ, গান ও মদ্যপানের ভিডিও প্রকাশ করে খামেনির মৃত্যুকে উদযাপন করেন—যেসব কর্মকাণ্ড ইসলামি শাসনব্যবস্থায় নিষিদ্ধ।

আবার অনেকে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশকের দমন-পীড়ন এবং বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তারা খামেনিকেই দায়ী মনে করেন।
যুদ্ধের পরও রাজনৈতিক বিভাজন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর জাতীয়তাবাদের আবেগ কিছুটা জোরালো হলেও ইরান এখনো গভীরভাবে বিভক্ত। জানুয়ারির সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে হাজারো মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি দেশটির রাজনীতিতে বড় ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। সরকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হতাহতের হিসাবেও বড় পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়েও ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। উভয় পক্ষ আগস্টের শেষ নাগাদ একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান।

তবে শেষযাত্রায় উপস্থিত অনেকেই নতুন সর্বোচ্চ নেতার কাছেও খামেনির মতো কঠোর অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ওপর আস্থা রাখার সুযোগ নেই।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিরাপত্তাজনিত কারণে শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন না। তবে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার আহমদ বাহিদিকে জনতার মধ্যে দেখা যায়।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, খামেনির শেষকৃত্যের সময় তিনি কোনো হামলার নির্দেশ দেবেন না। তার ভাষায়, “ওরা সবাই সেখানে আছে। এক হামলায় সবাইকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব, কিন্তু আমরা তা করছি না, কারণ তাহলে আলোচনার জন্য কাউকে পাওয়া যাবে না।”
খামেনির মরদেহ পরে শিয়া মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র নগরী কোমে নেওয়া হয়। শেষ দাফন সম্পন্ন হবে তার জন্মশহর মাশহাদে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















