রোমান শাসনের পতনের পর জার্মানিক বিভিন্ন গোত্রের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যগুলোর আবির্ভাব ব্রিটেনের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি। কিন্তু কী কারণে এই নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ নিক হাইয়াম তুলে ধরেছেন অ্যাংলো-স্যাক্সনদের উত্থানের কাহিনি।
রোমান শাসনের অবসানের পর কীভাবে বিচ্ছিন্ন জার্মানিক গোত্রগুলো ধীরে ধীরে ব্রিটেনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইংল্যান্ডের জন্মের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন নিক হাইয়াম।
ইংল্যান্ডের অস্থির জন্ম
ইতিহাসজুড়ে বহু স্কটের মনে ইংরেজদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করেছে। ওয়েলসের মানুষের মধ্যেও একই অনুভূতি ছিল। ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড—যিনি ‘হ্যামার অব দ্য স্কটস’ নামে পরিচিত এবং ওয়েলসের বড় অংশও দখল করেছিলেন—এই বৈরিতার জন্য অনেকটাই দায়ী। তবে এই দ্বন্দ্বের মূল শিকড় আরও বহু শতাব্দী আগে, রোমান ব্রিটেনের পতন এবং অ্যাংলো-স্যাক্সনদের আগমনের সময়ে নিহিত।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, লৌহযুগে ব্রিটেনে কেল্টিক গোত্রগুলোর বসবাস ছিল। পরে আসে রোমানরা। জুলিয়াস সিজারের অনুসন্ধানী অভিযানের প্রায় এক শতাব্দী পর, খ্রিস্টাব্দ ৪৩ সালে সম্রাট ক্লডিয়াস ব্রিটেন আক্রমণ করেন। পরবর্তী অর্ধশতকের মধ্যে দ্বীপটির দক্ষিণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোমানদের দখলে চলে যায় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় রোমান প্রদেশ ‘ব্রিটানিয়া’।
রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ব্রিটেনে সম্রাটের নিযুক্ত গভর্নর শাসন করতেন এবং রোমান সেনাবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করত।
কিন্তু পঞ্চম শতকে—বিশেষ করে খ্রিস্টাব্দ ৪১০ সালকে একটি মোড় ঘোরানো সময় হিসেবে ধরা হয়—ইউরোপ মহাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রোমান প্রশাসন ব্রিটেন ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই পূর্ব ব্রিটেনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে রোমান ধাঁচের শিল্পকর্মের পরিবর্তে দেখা যায় ধাতব অলংকার, মৃৎপাত্র, সমাধি-পদ্ধতি এবং স্থাপত্য, যা অ্যাংলো-স্যাক্সন সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ বলতে পরবর্তীকালে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের অ্যাঙ্গল, স্যাক্সন, জুট ও ফ্রিসিয়ানসহ বিভিন্ন জার্মানিক গোত্রকে বোঝানো হয়। অষ্টম শতকে ইতিহাসবিদ বেড তাদের ‘ইংরেজ জাতি’ (gens Anglorum) হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

গল্পটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর ভেতরে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কেন রোমান শাসনের পতন ঘটল? মহাদেশীয় ইউরোপের অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় ব্রিটেন কেন ভিন্ন পথ নিল? কী কারণে জার্মানিক জনগোষ্ঠী ব্রিটেনে আসতে শুরু করল? আর কীভাবে সপ্তম শতকের শুরুতেই তারা ব্রিটেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রধান শক্তিতে পরিণত হলো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে রোমান শাসনের সময় ব্রিটেনের জনগণ ও রোমান প্রশাসনের সম্পর্ক কেমন ছিল, তা বুঝতে হবে। কারণ রোমের সঙ্গে ব্রিটেনের যে দুর্বল সম্পর্ক ছিল, সেটিই পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের পতনের পর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আঞ্চলিক বিভাজন
রোমান শাসনামলে ব্রিটেনের পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত সমতল পূর্বাঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। পশ্চিমে কেল্টিক ব্রিটোনিক ভাষাই প্রধান ভাষা হিসেবে টিকে ছিল, যা পরবর্তীকালে ওয়েলশ ভাষায় রূপ নেয়। অন্যদিকে শহর, অভিজাতদের ভিলা, কারখানা, বিস্তৃত কৃষিজমি, মোজাইক অলংকরণ এবং গির্জা—এসব মূলত নিম্নভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ছিল। পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকাগুলো ছিল মূলত সামরিক ঘাঁটি কিংবা পশুপালনের অঞ্চল।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—নিম্নভূমিতেও ব্রিটোনিক ভাষা হারিয়ে যায়নি। রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ব্রিটিশদের সংযোগ ছিল সীমিত। খ্রিস্টাব্দ ৪০০ সালের আগে কোনো ব্রিটিশ সম্রাট হননি, এমনকি রোমান সিনেট বা উচ্চ প্রশাসনেও কোনো ব্রিটিশ উল্লেখযোগ্য পদে পৌঁছাতে পারেননি।
রোমের দৃষ্টিতে ব্রিটেন ছিল সাম্রাজ্যের এক প্রান্তিক অঞ্চল। রোমান কবি রুটিলিয়াস নামাতিয়ানুস একসময় ব্রিটেনের মানুষকে অবজ্ঞাভরে “অসভ্য কৃষক” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
অবশ্য ব্রিটেনের উর্বর নিম্নভূমি থেকে কর আদায় হতো এবং সেই অর্থে ধনী ভূমির মালিকরা রোমান ধাঁচের বিলাসবহুল ভিলা নির্মাণ করতেন। কিন্তু ৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিম রোমান সম্রাট ম্যাগনেনশিয়াস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় কনস্টান্টিয়াসের কাছে পরাজিত হন। ম্যাগনেনশিয়াসকে সমর্থন করেছিল ব্রিটেনের একটি অংশ, ফলে তার পরাজয়ের পর ব্রিটেনে শুরু হয় কঠোর দমন-পীড়ন।
সমসাময়িক ইতিহাসবিদ ও সৈনিক অ্যামিয়ানুস মার্সেলিনাস লিখেছেন, সম্রাটের প্রতিনিধি পলুস ক্যাটেনা—যিনি “পল দ্য চেইন” নামে পরিচিত ছিলেন—অপরাধী ও নির্দোষের পার্থক্য না করেই মানুষ ও সম্পত্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
অর্থনৈতিক পতনের সূচনা
এই ঘটনাকে ব্রিটেনে রোমান প্রভাবের অবক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হয়। ব্যাপক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ফলে বহু জমিদারি বিদেশি অভিজাতদের হাতে চলে যায়। গবেষকদের মতে, এ কারণেই অনেক রোমান ভিলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রদেশ থেকে সম্পদ বাইরে চলে যেতে থাকে, উৎপাদন কমে যায়, আমদানি ও সেবা খাত সংকুচিত হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে এবং ব্রিটেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়।
সমস্যা এখানেই থেমে থাকেনি। চতুর্থ শতকের শেষভাগে রোমান সাম্রাজ্য একের পর এক গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে। সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে যায়, অর্থের অভাব দেখা দেয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
উত্তরের সীমান্তে কিছু সেনা অবস্থান করলেও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি কার্যত প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্রপথে জলদস্যু ও বহিরাগতদের হামলার ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
রোমের বিদায়
প্রায় ১৪ থেকে ১৮ প্রজন্ম ধরে ব্রিটেন রোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। অতীতে নানা সংকট এলেও প্রতিবারই রোম পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
খ্রিস্টাব্দ ৪১০ সালে সম্রাট হনোরিয়াস ব্রিটিশ নগরগুলোর সাহায্যের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। তখন ধারণা করা হয়েছিল, এটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং পরে রোম আবার ফিরে আসবে।
কিন্তু ইউরোপজুড়ে চলমান যুদ্ধ, বর্বর জাতিগুলোর আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রোম আর কখনো ব্রিটেন পুনর্দখল করতে পারেনি।
সাম্রাজ্যের সীমানায় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

৪১০ সালের পর ব্রিটেন এক অদ্ভুত অবস্থায় পড়ে। দেশটি পুরোপুরি রোমান সাম্রাজ্যের অংশও নয়, আবার সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়। ইংলিশ চ্যানেলের ওপারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী রোমের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কখনো বাড়ত, কখনো কমত।
তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের অভিজাত শ্রেণি দীর্ঘ সময় তাদের ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা রোমান পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করত এবং খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য আরও দৃঢ় হয়।
লাতিন ভাষায় শিক্ষার ধারাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। ষষ্ঠ শতকের শিক্ষিত ধর্মযাজক গিলদাসসহ কয়েকজন ব্রিটিশ লেখকের রচনায় সেই ধারার প্রমাণ পাওয়া যায়।
৪২৯ সালেও গল (বর্তমান ফ্রান্স) থেকে আসা এক বিশপ ব্রিটিশ সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়ে স্যাক্সন ও পিক্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এটি দেখায় যে রোমান সামরিক সহায়তা না থাকলেও ব্রিটেন তখনও সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
আঞ্চলিক বিভাজন
রোমান শাসনামলে ব্রিটেনের পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত সমতল পূর্বাঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। পশ্চিমে কেল্টিক ব্রিটোনিক ভাষাই প্রধান ভাষা হিসেবে টিকে ছিল, যা পরবর্তীকালে ওয়েলশ ভাষায় রূপ নেয়। অন্যদিকে শহর, অভিজাতদের ভিলা, কারখানা, বিস্তৃত কৃষিজমি, মোজাইক অলংকরণ এবং গির্জা—এসব মূলত নিম্নভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ছিল। পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকাগুলো ছিল মূলত সামরিক ঘাঁটি কিংবা পশুপালনের অঞ্চল।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—নিম্নভূমিতেও ব্রিটোনিক ভাষা হারিয়ে যায়নি। রোমান সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ব্রিটিশদের সংযোগ ছিল সীমিত। খ্রিস্টাব্দ ৪০০ সালের আগে কোনো ব্রিটিশ সম্রাট হননি, এমনকি রোমান সিনেট বা উচ্চ প্রশাসনেও কোনো ব্রিটিশ উল্লেখযোগ্য পদে পৌঁছাতে পারেননি।
রোমের দৃষ্টিতে ব্রিটেন ছিল সাম্রাজ্যের এক প্রান্তিক অঞ্চল। রোমান কবি রুটিলিয়াস নামাতিয়ানুস একসময় ব্রিটেনের মানুষকে অবজ্ঞাভরে “অসভ্য কৃষক” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
অবশ্য ব্রিটেনের উর্বর নিম্নভূমি থেকে কর আদায় হতো এবং সেই অর্থে ধনী ভূমির মালিকরা রোমান ধাঁচের বিলাসবহুল ভিলা নির্মাণ করতেন। কিন্তু ৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিম রোমান সম্রাট ম্যাগনেনশিয়াস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় কনস্টান্টিয়াসের কাছে পরাজিত হন। ম্যাগনেনশিয়াসকে সমর্থন করেছিল ব্রিটেনের একটি অংশ, ফলে তার পরাজয়ের পর ব্রিটেনে শুরু হয় কঠোর দমন-পীড়ন।
সমসাময়িক ইতিহাসবিদ ও সৈনিক অ্যামিয়ানুস মার্সেলিনাস লিখেছেন, সম্রাটের প্রতিনিধি পলুস ক্যাটেনা—যিনি “পল দ্য চেইন” নামে পরিচিত ছিলেন—অপরাধী ও নির্দোষের পার্থক্য না করেই মানুষ ও সম্পত্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
অর্থনৈতিক পতনের সূচনা
এই ঘটনাকে ব্রিটেনে রোমান প্রভাবের অবক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হয়। ব্যাপক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ফলে বহু জমিদারি বিদেশি অভিজাতদের হাতে চলে যায়। গবেষকদের মতে, এ কারণেই অনেক রোমান ভিলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রদেশ থেকে সম্পদ বাইরে চলে যেতে থাকে, উৎপাদন কমে যায়, আমদানি ও সেবা খাত সংকুচিত হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে এবং ব্রিটেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়।
সমস্যা এখানেই থেমে থাকেনি। চতুর্থ শতকের শেষভাগে রোমান সাম্রাজ্য একের পর এক গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে। সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে যায়, অর্থের অভাব দেখা দেয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
উত্তরের সীমান্তে কিছু সেনা অবস্থান করলেও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি কার্যত প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্রপথে জলদস্যু ও বহিরাগতদের হামলার ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
রোমের বিদায়
প্রায় ১৪ থেকে ১৮ প্রজন্ম ধরে ব্রিটেন রোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। অতীতে নানা সংকট এলেও প্রতিবারই রোম পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
খ্রিস্টাব্দ ৪১০ সালে সম্রাট হনোরিয়াস ব্রিটিশ নগরগুলোর সাহায্যের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরাই গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। তখন ধারণা করা হয়েছিল, এটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং পরে রোম আবার ফিরে আসবে।
কিন্তু ইউরোপজুড়ে চলমান যুদ্ধ, বর্বর জাতিগুলোর আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রোম আর কখনো ব্রিটেন পুনর্দখল করতে পারেনি।
সাম্রাজ্যের সীমানায় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
৪১০ সালের পর ব্রিটেন এক অদ্ভুত অবস্থায় পড়ে। দেশটি পুরোপুরি রোমান সাম্রাজ্যের অংশও নয়, আবার সম্পূর্ণ স্বাধীনও নয়। ইংলিশ চ্যানেলের ওপারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী রোমের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কখনো বাড়ত, কখনো কমত।
তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের অভিজাত শ্রেণি দীর্ঘ সময় তাদের ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা রোমান পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার করত এবং খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য আরও দৃঢ় হয়।
লাতিন ভাষায় শিক্ষার ধারাও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। ষষ্ঠ শতকের শিক্ষিত ধর্মযাজক গিলদাসসহ কয়েকজন ব্রিটিশ লেখকের রচনায় সেই ধারার প্রমাণ পাওয়া যায়।
৪২৯ সালেও গল (বর্তমান ফ্রান্স) থেকে আসা এক বিশপ ব্রিটিশ সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়ে স্যাক্সন ও পিক্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এটি দেখায় যে রোমান সামরিক সহায়তা না থাকলেও ব্রিটেন তখনও সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
ভাড়াটে সৈন্য থেকে স্থায়ী বসতি
পঞ্চম শতকের শুরুতে ব্রিটেনের নিম্নভূমি ক্রমেই বহিরাগতদের আক্রমণের মুখে পড়তে থাকে। স্যাক্সনদের সমুদ্রপথে হামলার কথা সমসাময়িক গলীয় ইতিহাসকাররা উল্লেখ করেছেন। একই সময়ে গিলদাস লিখেছেন উত্তরের পিক্ট এবং পশ্চিমের স্কটদের ধারাবাহিক আক্রমণের কথাও।
এ সময় ব্রিটেনের অর্থনীতিতেও পরিবর্তন দেখা দেয়। কৃষিকাজের গুরুত্ব কিছুটা কমে পশুপালনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। ফলে কর আদায় কমে যায় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অর্থের সংকট দেখা দেয়।
এই সংকট মোকাবিলায় ব্রিটিশ শাসকেরা নতুন পথ বেছে নেন। আগে যে জমি রোমান রাষ্ট্র বা বিদেশে বসবাসকারী জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখান থেকে প্রাপ্ত সম্পদ ব্যবহার করে তারা ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ করতে শুরু করেন। এসব সৈন্যের বড় অংশই ছিল উত্তর ইউরোপের জার্মানিক গোত্রের সদস্য—যাদের পরবর্তীকালে সম্মিলিতভাবে অ্যাংলো-স্যাক্সন বলা হয়।
প্রাথমিকভাবে এই ব্যবস্থা ছিল সাময়িক। উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে আসা জলদস্যু ও আক্রমণকারীদের প্রতিহত করা। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরিণতি হয় সুদূরপ্রসারী।
![]()
অ্যাংলো-স্যাক্সনদের প্রথম বসতি
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, ব্রিটেনে সবচেয়ে প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন কবরস্থানগুলোর তারিখ প্রায় ৪২০ খ্রিস্টাব্দ। নরফোকের স্পং হিলসহ বিভিন্ন স্থানের নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, ৪২০ থেকে ৪৬০ সালের মধ্যে উত্তর ইউরোপ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ব্রিটেনে এসে বসতি গড়ে তোলে।
অভ্যন্তরীণ এলাকায় পাওয়া অ্যাংলো-স্যাক্সন এবং কখনও কখনও আইরিশ নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, শুধু সীমান্ত প্রতিরক্ষায় নয়, স্থানীয় শাসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবেও এসব ভাড়াটে যোদ্ধাকে নিয়োগ করা হতো।
লিংকনশায়ার ও সাসেক্সের মতো অঞ্চলে অ্যাংলো-স্যাক্সন কবরস্থানের বিস্তৃতি ইঙ্গিত দেয় যে শুরুতে তাদের বসতি স্থাপন ব্রিটিশ আঞ্চলিক শাসকদের অনুমতি ও তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল।
কিন্তু এই ব্যবস্থার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বড় ঝুঁকি।
যে যোদ্ধাদের নিজেদের স্বজাতির আক্রমণ ঠেকানোর জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল, তারাই একসময় নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে স্থানীয় অভিজাতদের সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেখতে শুরু করে। ভাড়াটে সৈন্যদের কাছে নতুন মানুষ এনে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা ছিল অনেক বেশি লাভজনক।
শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়
এক গলীয় ইতিহাসকার লিখেছেন, প্রায় ৪৪১ সালের মধ্যে “ব্রিটেনের প্রদেশগুলো স্যাক্সনদের শাসনের অধীনে চলে যায়।”
যদিও এই মন্তব্য কিছুটা সরলীকৃত এবং দূর থেকে লেখা, তবুও এটি ইঙ্গিত দেয় যে ওই সময়ের মধ্যেই নরফোক ও পূর্ব মিডল্যান্ডসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল অ্যাংলো-স্যাক্সনদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
অন্যদিকে গিলদাস উল্লেখ করেন, ৪৪৬ থেকে ৪৫৪ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সেনাপতি ফ্লাভিয়াস এইটিয়াসের কাছে সাহায্য চেয়েছিল। তারা আশা করেছিল, রোম আবার সৈন্য পাঠাবে।
কিন্তু সেই সহায়তা আর আসেনি।
৪৫৪ সালে ফ্লাভিয়াস এইটিয়াস নিহত হলে ব্রিটেনে রোমের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে যায়।
এই সময় থেকেই গিলদাস তাঁর লেখায় ব্রিটিশ রাজাদের কথা উল্লেখ করতে শুরু করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে রোমান প্রশাসনের পরিবর্তে স্বাধীন ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল।

অ্যামব্রোসিয়াস অরেলিয়ানাসের আবির্ভাব
গিলদাস যেসব নেতার কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অ্যামব্রোসিয়াস অরেলিয়ানাস। তাঁকে তিনি রোমান বংশোদ্ভূত বলে বর্ণনা করেছেন এবং লিখেছেন, তাঁর বাবা-মা “রাজকীয় বেগুনি পোশাক” পরতেন—যা থেকে বোঝা যায়, তাঁরা ধনী ও প্রভাবশালী রোমান পরিবারভুক্ত ছিলেন।
গিলদাসের বর্ণনা অনুযায়ী, অ্যামব্রোসিয়াস ব্রিটিশ বাহিনীকে সংগঠিত করে স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে একাধিক সফল অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্রিটিশরা অন্তত সাময়িকভাবে আগ্রাসন প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে পরবর্তী সংঘাতের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন আরেক শাসক—যাকে গিলদাস “অহংকারী স্বৈরশাসক” বলে অভিহিত করেছেন। পরে ইতিহাসবিদ বেড এই শাসকের নাম উল্লেখ করেন—ভর্টিগার্ন (Vortigern)।
ভর্টিগার্নের সিদ্ধান্ত: এক ঐতিহাসিক ভুল
গিলদাসের বর্ণনায় ব্রিটেনের সংকটময় সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন সেই শাসক, যাকে তিনি “অহংকারী স্বৈরশাসক” বলে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী ইতিহাসবিদ বেড তাঁর নাম দেন ভর্টিগার্ন (Vortigern)।
ভর্টিগার্ন বিদেশ থেকে আরও বেশি সংখ্যক স্যাক্সন যোদ্ধাকে ব্রিটেনে নিয়ে আসেন। তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো রোমান আমলের প্রচলিত করব্যবস্থার মাধ্যমে—অর্থাৎ কৃষিজ পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে।
নবম শতকের গ্রন্থ হিস্টোরিয়া ব্রিটোনাম-এ ভর্টিগার্নের বংশপরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি গ্লুচেস্টার অঞ্চলের একটি খ্রিস্টান রোমান পরিবারের বংশধর ছিলেন। এতে বোঝা যায়, সে সময় ব্রিটেনের রাজনৈতিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলের সমৃদ্ধ নিম্নভূমিতে সরে যাচ্ছিল, যেখানে রোমান প্রদেশ ব্রিটানিয়া প্রাইমা-এর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল সিরেনসেস্টার।
সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে কাছাকাছি চেডওয়ার্থ ভিলায় পঞ্চম শতকের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নির্মিত একটি চমৎকার মোজাইক মেঝে আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পশ্চিমাঞ্চলের এই অঞ্চলে রোমান সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি বিনিয়োগ পূর্বাঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল।
সাময়িক সমাধান থেকে স্থায়ী বিপর্যয়
গিলদাসের মতে, পূর্ব উপকূল রক্ষার জন্য “বর্বর” ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ করা ছিল এক মারাত্মক ভুল। যদিও রোমান সাম্রাজ্যে এই ধরনের ব্যবস্থা অস্বাভাবিক ছিল না, ব্রিটেনের ক্ষেত্রে এর ফল হয় বিপর্যয়কর।
একসময় এই ভাড়াটে যোদ্ধারাই বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এরপর শুরু হয় একের পর এক ধ্বংসাত্মক আক্রমণ, যা গিলদাসের ভাষায় “সমুদ্র থেকে সমুদ্র পর্যন্ত” ছড়িয়ে পড়েছিল।
উভয় পক্ষই বিভিন্ন সময়ে বিজয় অর্জন করে। ষষ্ঠ শতকের সূচনালগ্নে ব্যাডন পর্বতের (Mons Badonicus) যুদ্ধে ব্রিটিশরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যও পায়। গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এই যুদ্ধ বর্তমান বাথের কাছে লিটল সলসবেরি হিল অথবা ডরসেটের ব্যাডবারি রিংসে সংঘটিত হয়েছিল।
কিন্তু এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
শেষ পর্যন্ত স্যাক্সনরাই বিজয়ী হয় এবং ব্রিটেনের নিম্নভূমির অধিকাংশ অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
বিজয়ের পর নতুন বাস্তবতা
গিলদাস এমন একটি শান্তিচুক্তির উল্লেখ করেছেন, যা যুদ্ধের অবসান ঘটায়। যদিও চুক্তিটির নাম জানা যায় না, ইতিহাসবিদদের ধারণা, এর মাধ্যমে নিম্নভূমির অধিকাংশ অঞ্চলে স্যাক্সনদের কর্তৃত্ব স্বীকৃতি পায়।
এই সময় অ্যাংলো-স্যাক্সনদের জনসংখ্যা, অভিবাসন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সম্পর্কে তথ্য সীমিত। তবু প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—দক্ষিণ ও পূর্ব ব্রিটেনের উর্বর কৃষিজমিতে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় ব্রিটিশ মানুষ থেকেই গিয়েছিল।
তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি।
বরং নতুন শাসকদের অধীনে কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
গিলদাস লিখেছেন, তাঁর দাদা-দাদিদের প্রজন্মের বহু মানুষ “চিরকালের জন্য দাসে” পরিণত হয়েছিল।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় প্রাচীন ইংরেজি ভাষাতেও। Wealas—যেখান থেকে বর্তমান Welsh শব্দটির উৎপত্তি—এর অর্থ ছিল একই সঙ্গে “বিদেশি” এবং “দাস”।
প্রাচীন ইংরেজ আইনি নথিতে কৃষিদাসদের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ৬৮০-এর দশকে যখন বিশপ উইলফ্রিড সেলসি অঞ্চলে একটি বিশাল সম্পত্তি লাভ করেন, তখন সেই সম্পত্তির সঙ্গে প্রায় ২৫০ জন দাসও তাঁর অধীনে আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, এদের অধিকাংশই সম্ভবত ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ছিল।
দখল, কিন্তু সম্পূর্ণ উচ্ছেদ নয়

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এখনও অসম্পূর্ণ হওয়ায় কোথায় কতজন অ্যাংলো-স্যাক্সন বসতি স্থাপন করেছিল এবং কোথায় ব্রিটিশ জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল—তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে বেডের লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ৬০০ খ্রিস্টাব্দে নর্থামব্রিয়ার অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা অ্যাথেলফ্রিথ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক বড় যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এর পরাজিত অঞ্চলগুলোর কিছু থেকে কর আদায় করা হতো, আবার কিছু এলাকায় নতুন অ্যাংলো-স্যাক্সন বসতি স্থাপন করা হয়।
এতে বোঝা যায়, ইংল্যান্ডের সম্প্রসারণ কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, পরিকল্পিত উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমেও এগিয়ে চলেছিল।
গিলদাসের চোখে ‘ঈশ্বরহীন আগন্তুক’
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ডি এক্সসিডিও এট কনকোয়েস্তু ব্রিটানিয়ে (De Excidio et Conquestu Britanniae)-তে গিলদাস ব্রিটেনের ঘটনাবলিকে পুরাতন নিয়মে (ওল্ড টেস্টামেন্ট) বর্ণিত অ্যাসিরীয়দের হাতে জুডিয়া দখলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর কাছে স্যাক্সনরা ছিল এমন এক ‘ঈশ্বরহীন’ বিদেশি জাতি, যাদের সঙ্গে সহাবস্থান নয়, বরং যেকোনো মূল্যে দেশ থেকে বিতাড়িত করা উচিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মহাদেশীয় ইউরোপের পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
সেই সময় গল-রোমান বিশপরা ফ্রাঙ্ক ও বার্গান্ডিয়ানদের মতো জার্মানিক জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাদের নিজেদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করছিলেন। অর্থাৎ ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে জার্মানিক জাতিগোষ্ঠীগুলোকে খ্রিস্টান সমাজে গ্রহণ করা হচ্ছিল, কিন্তু ব্রিটেনে জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিভাজন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।
যুদ্ধেই জন্ম নেয় ইংল্যান্ড
ইতিহাসবিদ নিক হাইয়ামের মতে, ইংল্যান্ডের জন্ম মূলত সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ঘটেছিল।
তবে শুধু সামরিক বিজয়ই অ্যাংলো-স্যাক্সনদের সাফল্যের কারণ নয়। ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে যে প্রবল জাতিগত ও আদর্শগত বৈরিতা তারা অনুভব করেছিল, সেটিও তাদের নিজস্ব জার্মানিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ফলে ব্রিটেনে এমন এক বিশাল পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়, যার সমতুল্য রোমান বা সাবেক রোমান পশ্চিম ইউরোপের অন্য কোথাও ছিল না।
রোমের নতুন উদ্যোগ

ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে ফ্রাঙ্কিশ রাজারা দক্ষিণ-পূর্ব ব্রিটেনে খ্রিস্টধর্ম বিস্তারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এরপর ৫৯০-এর দশকে পোপ গ্রেগরি প্রথম ইতালি থেকে অগাস্টিনের নেতৃত্বে একদল সন্ন্যাসীকে কেন্টে পাঠান।
রোমের ধারণা ছিল, ব্রিটিশ চার্চের যাজকেরা এই মিশনারিদের সহায়তা করবে।
কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
ব্রিটিশ ধর্মযাজকেরা বিশ্বাস করতেন, একদিন ঈশ্বর নিজেই এই ‘বর্বর’ আগন্তুকদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন। ফলে তারা রোমের এই ধর্মীয় উদ্যোগে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান।
খ্রিস্টধর্মে বিভক্ত ব্রিটেন
এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটেনের খ্রিস্টধর্ম দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
রোমের মিশনারিরা ব্রিটিশ চার্চকে কার্যত ভ্রান্ত মতাবলম্বী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। একই সময়ে তারা নতুন ধর্মান্তরিত অ্যাংলো-স্যাক্সনদের পূর্ণ সমর্থন দেয়।
রোমের ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজনৈতিক ক্ষমতা একত্রে এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়, যা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দুর্বল করে দেয়।
যেসব অঞ্চলে অ্যাংলো-স্যাক্সন শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে ব্রিটিশ ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় ক্রমে বিলীন হতে থাকে।
ওয়েলশ ভাষা এবং ব্রিটিশ ঐতিহ্য টিকে থাকে মূলত সেইসব এলাকায়, যেগুলো এখনো ব্রিটিশ রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং যেখানে ইংরেজ রাজশক্তি কিংবা অ্যাংলো-রোমান চার্চের প্রভাব পৌঁছায়নি।
সম্পর্কের বিচ্ছেদই বদলে দেয় ইতিহাস
নিক হাইয়ামের মতে, ব্রিটিশ ও রোমান চার্চের এই বিচ্ছেদই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং দক্ষিণ ও পূর্ব ব্রিটেনে ইংরেজদের আধিপত্য স্থায়ী করে।
তবে তিনি মনে করেন, এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত ছিল—রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের দুর্বল সম্পর্কের মধ্যে।
ব্রিটিশরা তাদের কেল্টিক ভাষা ধরে রেখেছিল, সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনে কখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পায়নি, উর্বর কৃষিজমির বড় অংশ বিদেশে বসবাসকারী জমিদারদের মালিকানায় ছিল এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ও মূলত ‘ব্রিটিশ’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এই কারণেই রোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর তারা কার্যত একা হয়ে যায়।
যখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিয়োগ করা স্যাক্সন ভাড়াটে সৈন্যরাই বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করে, তখন ব্রিটিশদের সাহায্যে এগিয়ে আসার মতো আর কোনো সাম্রাজ্য অবশিষ্ট ছিল না।
ইংল্যান্ডের ভিত্তি
ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে বর্তমান উত্তর ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব স্কটল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলও ধীরে ধীরে অ্যাংলো-স্যাক্সনদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এরপর স্বাধীন ব্রিটিশ রাজ্যগুলো সীমিত হয়ে পড়ে ক্লাইড উপত্যকা, ওয়েলস এবং কর্নওয়ালে।
সেখানে কেল্টিক ভাষা টিকে ছিল, সঙ্গে টিকে ছিল এই বিশ্বাসও যে একদিন ঈশ্বরের ইচ্ছায় ইংরেজরা দখল করা ভূমি ছেড়ে চলে যাবে।
দশম শতকের ওয়েলশ কাব্য আর্মেস প্রাইডেইন (The Prophecy of Britain)-এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, একদিন স্যাক্সনদের বিতাড়িত করা হবে এবং ব্রিটিশরা আবার সমগ্র ব্রিটেন পুনরুদ্ধার করবে।
নিক হাইয়াম শেষ করেন এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য দিয়ে—
“তারা এখনও সেই দিনের অপেক্ষায় আছে।”
( এই প্রতিবেদন তৈরিতে হিস্টিরি ম্যাগাজিন সহ অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের কিছু উপন্যাস ও ইতিহাস বইয়ের ও চলচ্চিত্র’র সাহায্য নেয়া হয়েছে।)
বিশেষ প্রতিবেদন 





















