দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় পুরো অঞ্চলই একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, দক্ষতা উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তাও বহন করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের মধ্যে মাত্র প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের মাত্র ৫৯ শতাংশ বর্তমানে কর্মরত, যেখানে অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিতে এ হার প্রায় ৭০ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থান—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয় এবং যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত।
বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং মানসম্মত চাকরির সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবেদনটিতে নারী কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে মাত্র একজন শ্রমবাজারে অংশ নেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের সমপর্যায়ে উন্নীত করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশের সফল উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরেছে। ভারতে কারিগরি প্রশিক্ষণ তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়েছে, নেপালে ব্যবসা ইনকিউবেশন কর্মসূচি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করেছে এবং শ্রীলঙ্কায় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নারীদের নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত হতে সহায়তা করেছে। এসব উদ্যোগ দেখিয়েছে যে সঠিক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা থাকলে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের উদাহরণও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। দেশের উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নারীনেতৃত্বাধীন ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে দেশের বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করবে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। এজন্য সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশও যদি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগে আরও জোর দেয়, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























