কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভিডি সতীশন বিধানসভায় আন্তঃরাজ্য শ্রমিকদের আয় নিয়ে “বিপরীত রেমিট্যান্স” শব্দবন্ধ ব্যবহার করার পর রাজ্যে নতুন করে কেরালার অভিবাসী শ্রমিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, উপসাগরীয় দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স কেরালাকে যতটা শক্তি দেয়, ঠিক তেমনই অন্য রাজ্যের শ্রমিকদের মজুরি রাজ্যের অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে যায়। সতীশনের হিসাবে রাজ্যে প্রায় ৪০ লাখ আন্তঃরাজ্য শ্রমিক কাজ করেন। বিরোধী সিপিআই(এম) নেতা ও প্রাক্তন শ্রমমন্ত্রী ভি সিভানকুট্টি এই মন্তব্যকে অপমানজনক ও কেরালার শ্রম-সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে আক্রমণ করেছেন।
সিভানকুট্টি, যিনি বাম শ্রমিক সংগঠন সিটুর রাজ্য সম্পাদকও, বলেছেন প্রবাসী মালয়ালিদের নিয়ে গর্ব করা হলেও ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের বোঝা হিসেবে দেখানো স্ববিরোধী। তাঁর ভাষ্যে, এই শ্রমিকরা বিনা প্রতিদানে টাকা নিয়ে যান না, বরং শ্রম দিয়ে মজুরি অর্জন করেন। কবি কে সচ্চিদানন্দনও প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে বর্ণবিদ্বেষী ভাষা বলে অভিহিত করে তা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। কেরালার অভিবাসী শ্রমিক বিতর্ক তাই এখন কেবল অর্থনৈতিক আলোচনা নয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কেও রূপ নিয়েছে।
একটি গবেষণা সংস্থার হিসাবে কেরালা থেকে বছরে প্রায় ৪৩ হাজার ৩৭৮ কোটি রুপি বাইরে যায়, যা বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সেই সংস্থার হিসাবে রাজ্যে আন্তঃরাজ্য শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ, যা সরকারি হিসাবের চেয়ে কম। নির্মাণ, হোটেল ও কৃষিতে নিয়োজিত এই শ্রমিকদের বড় অংশ স্বাস্থ্যবিমা বা ভবিষ্যনিধির সুরক্ষা পান না। কেরালার অভিবাসী শ্রমিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে এই প্রশ্ন, একজন শ্রমিকের মজুরিকে কখন আয় আর কখন ক্ষতি বলা হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা অপরিচিত নয়। দেশের অর্থনীতি প্রবাসী আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল, কিন্তু দেশের ভেতরে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন কখনো ওঠেনি তা নয়। কেরালার অভিবাসী শ্রমিক বিতর্ক দেখিয়ে দেয়, রেমিট্যান্সকে শুধু সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে শ্রমিকের মর্যাদার প্রশ্ন হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলেও ভিনদেশি বা ভিনজেলার শ্রমিকদের মজুরি প্রবাহকে খরচ নয়, উৎপাদনের অংশ হিসেবে দেখাই বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
সিভানকুট্টির অভিযোগের পর মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মন্তব্য প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত এখনও আসেনি। সরকারি হিসাবে ৪০ লাখ আর গবেষণা সংস্থার হিসাবে ৩৫ লাখ, এই ফারাকই বলে দেয় বিতর্কটি এখনও প্রাথমিক পরিসংখ্যানের স্তরে আটকে আছে। দুই পক্ষের সংখ্যা না মিললে বিপরীত রেমিট্যান্স রাজনৈতিক বয়ান থেকে নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিণত হওয়া কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















