বাংলা একাডেমির সভাপতি, বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যসমালোচক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। রোববার দুপুরে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সেরাজ সালেকীনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুপুর আড়াইটার দিকে তার মৃত্যু হয়।
দীর্ঘ শিক্ষকতা, বিস্তৃত লেখালেখি
আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ৪০ বছর শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। শিক্ষক, সাহিত্যসমালোচক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তার জগতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন।
তার লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজ-ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যকে মিলিয়ে দেখা। তিনি শুধু পাঠ বিশ্লেষণ করেননি, বরং বাংলা ভাষা, জাতীয় সংস্কৃতি, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট নিয়েও লিখেছেন।
প্রথম বই ও গবেষণা
তার প্রথম বই “মুক্তিসংগ্রাম” প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। পরবর্তী সময়ে তার ৩২টি বই প্রকাশিত হয়। তিনি একটি অনুবাদগ্রন্থ এবং ২৩টি সম্পাদিত বইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তার ২৫০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
এই বিস্তৃত কাজ তাকে শুধু একাডেমিক পরিসরে নয়, পাঠক ও চিন্তাশীল সমাজের মধ্যেও পরিচিত করে। বাংলা সাহিত্যসমালোচনায় তিনি এমন এক ধারার প্রতিনিধি ছিলেন, যেখানে সাহিত্যকে সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়নি।
পুরস্কার ও ভাষা-আন্দোলনের চেতনা
আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি ২০০৪ সালে অলক্ত স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ লেখক সমিতির হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৯১ সালে কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।
তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাঙালির বৌদ্ধিক স্বাধীনতা, যুক্তিশীলতা এবং গণমানুষের উন্নয়ন।
ব্যক্তিগত শোকের ইতিহাসও তার জীবনের অংশ
তার ছেলে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার, ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গি হামলায় নিহত হন। সেই ব্যক্তিগত শোকও আবুল কাসেম ফজলুল হকের জনজীবন ও চিন্তার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য ও বৌদ্ধিক পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠের অবসান হলো। তবে তার লেখা, শিক্ষাদান এবং ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে অবস্থান ভবিষ্যৎ আলোচনায় ফিরে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















