নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চুরির অভিযোগে ২২ বছর বয়সী এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আবারও গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত সহিংসতার ভয়াবহতা সামনে এনেছে। নিহত যুবকের নাম জিসান। তিনি পশ্চিম মাসদাইর এলাকার ইউনুস ওরফে ইনু মিয়ার ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, শনিবার রাত ১০টার দিকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আল ফালাহর একজন সংগঠক এবং মসজিদের ইমাম কাওসার আহমেদসহ কয়েকজন ব্যক্তি মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগে জিসানকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে বেঁধে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। অচেতন অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজনরা খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অভিযোগ থেকে মৃত্যু, মাঝখানে আইনের অনুপস্থিতি
এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কোনো অভিযোগ উঠলেই কি কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার সমাজের কারও আছে? চুরি, ছিনতাই বা অন্য যেকোনো অপরাধের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়ার বিষয়। তদন্ত, প্রমাণ, বিচার এবং শাস্তির জন্য আদালত আছে। কিন্তু গণপিটুনি সেই পুরো প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করে।
অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, কাউকে বেঁধে মারধর করা আইনত অপরাধ। আর সেই মারধরে মৃত্যু হলে বিষয়টি আরও গুরুতর। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় “চোর সন্দেহে” গণপিটুনির ঘটনা বহুবার দেখা গেছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই একটি সাধারণ বিপদ থাকে। জনতার উত্তেজনা, গুজব, স্থানীয় প্রভাবশালী কারও নেতৃত্ব এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর অবিশ্বাস একসঙ্গে মিলে সহিংসতা তৈরি করে।
ভিডিও ঘিরে নতুন উদ্বেগ
ঘটনার পর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে বলে UNB জানিয়েছে। সেখানে কাওসার আহমেদকে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান করতে এবং অপরাধীকে জনতা হত্যা করলে আইনগত পরিণতি হবে না, এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যদি ভিডিওটির বিষয়বস্তু তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়, বরং গণসহিংসতাকে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ হিসেবেও দেখা দরকার।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেছেন, জিসানের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং ঘটনা তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
মৃত্যুর পর এলাকায় উত্তেজনা
জিসানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার পরিবার ও বন্ধুরা লাঠিসোঁটা নিয়ে এলাকায় ভাঙচুর চালায় বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যায়, একটি অবৈধ সহিংসতা আরেকটি উত্তেজনা তৈরি করে। এ ধরনের ঘটনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
গণপিটুনি কখনো ন্যায়বিচার নয়। বরং এটি আইন, মানবাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। অপরাধ দমনের নামে যদি জনতা নিজেই বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে, তাহলে নিরীহ মানুষও একইভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের গ্রেপ্তার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















