কোনো শিক্ষক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে বার্তা পাঠানোর আগে “অনুমতি চাই”, “স্যার, অনুমতি নিয়ে বলছি” বা “জ্বি, প্রস্তুত আছি”—এ ধরনের বাক্য এখন অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। অনেকেই এগুলোকে কেবল ভদ্রতার ভাষা বলে মনে করেন। কিন্তু ভাষা কখনোই শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ক্ষমতার সম্পর্ক, সামাজিক মানসিকতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন। তাই নাগরিক জীবনে সামরিক পরিভাষার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিছক ভাষাগত পরিবর্তন নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
যে সমাজে সমতা, যুক্তি এবং স্বাধীন মত প্রকাশ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিত্তি হওয়ার কথা, সেখানে যদি কথোপকথনের শুরুতেই অনুমতি চাওয়া বাধ্যতামূলক সামাজিক রীতি হয়ে ওঠে, তবে প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যিই কেবল সৌজন্য, নাকি ক্ষমতার কাঠামোকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার এক অদৃশ্য প্রক্রিয়া?
ভাষা কখন সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি
প্রতিটি সমাজের ভাষা তার ইতিহাস বহন করে। কোনো দেশের সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত ভাষা সাধারণত কঠোর শৃঙ্খলা, ঊর্ধ্বতন-নিম্নতনের সম্পর্ক এবং নির্দেশ মেনে চলার সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে “অনুমতি”, “প্রস্তুত”, “আদেশ পালন” বা “জি স্যার” ধরনের শব্দের ব্যবহার কার্যকর ও প্রয়োজনীয়।
![Week 4: Language, Culture, and Thought [Reflection] – Topics in Sociolinguistics](https://topicsinsociolinguistics.school.blog/wp-content/uploads/2019/08/3fea583fd65be369d068a4ef143dd11e.jpg)
কিন্তু একই ভাষা যখন বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা ভিন্ন অর্থ তৈরি করে। ধীরে ধীরে মানুষ এমন একটি আচরণবিধি গ্রহণ করতে শুরু করে, যেখানে মত প্রকাশের আগে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হয় এবং কর্তৃত্বকে অঘোষিতভাবে স্বীকার করে নিতে হয়।
এটি প্রায়ই সচেতন সিদ্ধান্ত নয়। অধিকাংশ মানুষ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে এই ভাষা ব্যবহার করেন। নতুন প্রজন্মও দেখে শেখে যে নির্দিষ্ট ধরনের শব্দ ব্যবহার না করলে তাকে যথেষ্ট ভদ্র বা শ্রদ্ধাশীল মনে করা হবে না।
কর্তৃত্বের সংস্কৃতি কীভাবে টিকে থাকে
স্বৈরতান্ত্রিক বা দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা শুধু আইন বা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে না; তার ছাপ থেকে যায় মানুষের চিন্তা, অভ্যাস এবং ভাষায়ও।
যখন একটি সমাজ দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, তখন শৃঙ্খলা ও আনুগত্যকে স্বাভাবিক গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও সেই মানসিক কাঠামো দ্রুত বদলে যায় না। মানুষ অনেক সময় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দৃশ্যমান কর্তৃত্ব, স্পষ্ট নির্দেশ এবং কঠোর নিয়মকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করতে শুরু করে।
এই কারণেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও বহু দেশে সামরিক সংস্কৃতির কিছু উপাদান নাগরিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকে। ভাষা সেই উত্তরাধিকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশগুলোর একটি।
ভদ্রতা ও আনুগত্য এক জিনিস নয়
সমস্যা ভাষার অস্তিত্বে নয়, বরং ভাষার অন্তর্নিহিত মানসিকতায়। সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষক, প্রবীণ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিনয়ী আচরণ কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু সম্মান তখনই অর্থবহ, যখন তা পারস্পরিক হয়। যদি ভদ্রতার সংজ্ঞা এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে অধস্তন ব্যক্তি নিজের মত প্রকাশের আগেই অনুমতি চাইতে বাধ্য বোধ করেন, তাহলে সম্পর্কটি আর সমতার ভিত্তিতে থাকে না। সেখানে নাগরিক নয়, বরং অধীনস্থ পরিচয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
একটি আধুনিক কর্মপরিবেশে দক্ষতা, যুক্তি ও পেশাগত সক্ষমতাই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। ভাষা যদি সেই পরিবেশকে অযথা কঠোর ও ভীতিকর করে তোলে, তবে সৃজনশীলতা ও মুক্ত আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রতিষ্ঠানও বদলে যায়
যখন সামরিক ধাঁচের ভাষা নিয়মিত ব্যবহৃত হয়, তখন শুধু ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে একই সংস্কৃতি গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কেন্দ্রীভূত হয়, প্রশ্ন করার প্রবণতা কমে এবং নির্দেশ পালনই প্রধান মূল্যবোধে পরিণত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দপ্তর কিংবা অন্যান্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি হওয়া উচিত সমালোচনামূলক চিন্তা, মতের বৈচিত্র্য এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। অথচ ভাষা যদি ক্রমাগত একমুখী ক্ষমতার সম্পর্ককে বৈধতা দেয়, তাহলে সেই আদর্শ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তবে ভাষার পরিবর্তনের আরেকটি দিকও রয়েছে। অনেক তরুণ এখন একই সামরিক শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে রসিকতা, ব্যঙ্গ কিংবা ইন্টারনেট সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে একই শব্দ কখনো কর্তৃত্বের প্রতীক, আবার কখনো সেই কর্তৃত্বকে বিদ্রূপ করার মাধ্যম হয়ে উঠছে। ভাষার এই দ্বৈত ব্যবহার দেখায় যে সামাজিক অর্থ কখনো স্থির থাকে না।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রকৃত পরীক্ষা
কোনো সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু নির্বাচন বা সংবিধান দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ কীভাবে কথা বলে, কীভাবে দ্বিমত প্রকাশ করে এবং কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক ভাষার ব্যবহারকে অতিরঞ্জিত আতঙ্কের বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে এটিকে সম্পূর্ণ নিরীহ পরিবর্তন বলেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ ভাষা ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠানের চরিত্র এবং ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে।
একটি সুস্থ নাগরিক সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন ভাষার ওপর, যেখানে সম্মান থাকবে, কিন্তু অযৌক্তিক ভয় থাকবে না; শৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নয়; নেতৃত্ব থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মারেথা উলি 


















