ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও হাজারো পরিবার তাদের স্বজনদের খুঁজে ফিরছে। উদ্ধারকারী দল ধীরে ধীরে অভিযান গুটিয়ে নিচ্ছে এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে যাদের প্রিয়জন এখনও নিখোঁজ, তাদের কাছে সময় যেন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
২৪ জুনের শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় স্বজনদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চলের বহু ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের অপেক্ষা
কারাবালেদার একটি ১২ তলা আবাসিক ভবনের সামনে প্রতিদিনই অপেক্ষা করছেন রাউল আলভারাদো। তিনি বিশ্বাস করেন, তার মা, বাবা ও বড় ভাই এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচেই আছেন।
ভূমিকম্পের সময় তিনি ভবনের অন্য একটি কক্ষে থাকায় কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্যরা বের হতে পারেননি। তিনি জানান, ভবনটি ছিল বাসিন্দায় পরিপূর্ণ। তার এক প্রতিবেশীর পাঁচ নাতি-নাতনিও এখনও নিখোঁজ।
ধসে পড়া ভবনের কংক্রিটের স্তূপের মধ্যে এখনো দেখা যায় ভাঙা আসবাব, গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও দৈনন্দিন জীবনের নানা চিহ্ন। সেসবই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কয়েক দিন আগেও সেখানে কত মানুষের বসবাস ছিল।
উদ্ধারকাজে সময়ের সঙ্গে লড়াই
উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও দমকল সদস্যরা ধ্বংসস্তূপে ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে নিচের তলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কোথাও হাতে চালিত যন্ত্র, কোথাও বিদ্যুৎচালিত ড্রিল ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় আবার ভারী খননযন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলছে।
একজন স্বেচ্ছাসেবক জানান, তাদের দল ইতোমধ্যে অন্তত ১২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। সর্বশেষ আরও একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। তবে এখনও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
নিখোঁজদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে
ভূমিকম্পের পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে পেতে অনলাইনে একাধিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সেখানে এখনও কয়েক দশ হাজার মানুষের নাম নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে অনেককে জীবিত উদ্ধার বা নিরাপদ অবস্থায় পাওয়া গেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনলাইনে প্রকাশিত নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হলেও তা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে। সব নিখোঁজ ব্যক্তি ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছেন—এমনটি নিশ্চিত নয়, তবে হাজারো পরিবার এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
কেন এত ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ায় প্রথম কম্পনে দুর্বল হয়ে পড়া বহু ভবন দ্বিতীয় কম্পনে পুরোপুরি ধসে পড়ে। এতে অনেক মানুষ বের হওয়ার সুযোগই পাননি।
রড-সিমেন্টের বহুতল ভবন ধসে পড়লে বিপুল পরিমাণ ভারী কংক্রিটের স্তূপ তৈরি হয়। এসব ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের শনাক্ত করা এবং মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের তলাগুলো একটির ওপর আরেকটি চাপা পড়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান আরও ধীরগতির হয়ে যায়।
স্বজনদের প্রশ্ন, এত তাড়াহুড়া কেন
ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হওয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, এখনও যখন নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে ভেতরে কেউ জীবিত বা মৃত অবস্থায় আটকে আছেন কি না, তখন ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো মানবিক দিক থেকে উদ্বেগের।
নিখোঁজ স্বজনদের একজনের পরিবারের সদস্য বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর আগে ভেতরে আটকে থাকা মানুষের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, অনেক পরিবারের সদস্যের মরদেহও হয়তো খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে ভেঙে পড়া শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষের সন্ধান চলছে। প্রতিটি দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও, স্বজনদের কাছে অন্তত প্রিয়জনের শেষ খোঁজ পাওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরও হাজারো মানুষ নিখোঁজ। উদ্ধার অভিযান কমে এলেও স্বজনরা এখনও ধ্বংসস্তূপে প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষা করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















