বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক পারচেজিং ম্যানেজার্স’ ইনডেক্স (পিএমআই) জুন মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মে মাসের তুলনায় ৯.৯ পয়েন্ট কমে জুনে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫২.৯-এ। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে আবারও সংকোচনের চিত্র ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে কৃষি ও সেবা খাত সম্প্রসারণ ধরে রাখলেও সেই গতি আগের তুলনায় কমেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এই সূচক যৌথভাবে প্রস্তুত করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ। এতে যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের কারিগরি সহযোগিতা রয়েছে।
পিএমআই ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং নীতিনির্ধারণে সময়োপযোগী অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ধারণা দিতে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
অর্থনীতির খাতভিত্তিক ভিন্ন চিত্র
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জুনের ফলাফল দেখায় যে সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও সম্প্রসারণে থাকলেও বিভিন্ন খাতের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও উৎপাদন খাত দুর্বল নতুন অর্ডার, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে আবার সংকোচনে ফিরে গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতেও নতুন কাজ ও কার্যক্রম কমে যাওয়ায় সংকোচন দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষা মৌসুমের শুরু এবং ঈদ-পূর্ব চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব জুন মাসে ব্যবসায়িক পরিবেশকে দুর্বল করেছে।
কৃষি ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত
কৃষি খাত টানা দশম মাসের মতো সম্প্রসারণে থাকলেও মে মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও অর্ডারের জট টানা দ্বিতীয় মাস সংকোচনে ছিল।
অন্যদিকে সেবা খাত টানা ২১তম মাসের মতো সম্প্রসারণে রয়েছে। তবে নতুন ব্যবসা, কার্যক্রম, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় শ্লথ হয়েছে। একই সঙ্গে অর্ডারের জট আরও দ্রুত হারে কমেছে।
উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে চাপ
দুই মাস সম্প্রসারণে থাকার পর জুনে উৎপাদন খাত আবার সংকোচনে ফিরে আসে। নতুন অর্ডার, নতুন রপ্তানি, কর্মসংস্থান, সরবরাহ এবং অর্ডারের জট কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। যদিও কারখানার উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয় এবং আমদানি বাড়তে থাকে, তবে সেই গতি আগের তুলনায় কম ছিল। একই সময়ে উৎপাদন উপকরণের মূল্য আরও বেড়েছে এবং প্রস্তুত পণ্যের সূচক আবার সম্প্রসারণে ফিরেছে।
নির্মাণ খাতও মে মাসের সম্প্রসারণ ধরে রাখতে পারেনি। নতুন কাজ, নির্মাণ কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় খাতটি সংকোচনে চলে যায়। তবে উৎপাদন ব্যয় এবং অর্ডারের জটের সূচক আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা
জরিপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে দুর্বল চাহিদা জুন মাসে ব্যবসাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। এলপিজি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং শ্রম ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আর্থিক সীমাবদ্ধতা, চলমান সড়ক নির্মাণকাজের কারণে বিঘ্ন এবং নতুন করে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ব্যবসার ব্যয় আরও বাড়িয়েছে বলে অনেক প্রতিষ্ঠান মত দিয়েছে। কৃষি খাতের অংশগ্রহণকারীরা আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা এবং মৌসুমি চাহিদার পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করেছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ এবং সহায়ক সরকারি নীতির মাধ্যমে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক আস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচক অনুযায়ী কৃষি, নির্মাণ ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন খাতও আবার সম্প্রসারণে ফিরতে পারে বলে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পিএমআই ৫২.৯-এ, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে সংকোচন
বাংলাদেশের পিএমআই জুনে ৯.৯ পয়েন্ট কমে ৫২.৯-এ নেমেছে। উৎপাদন ও নির্মাণ খাত সংকুচিত হলেও কৃষি ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















