কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে টানা ভারী বৃষ্টিতে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত শিবিরগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে পৌঁছেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, কক্সবাজার ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ইতোমধ্যে মাটি সম্পূর্ণ স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ঘেরা রোহিঙ্গা শিবিরগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঝুঁকি বাড়াচ্ছে টানা বৃষ্টি
টানা বৃষ্টি, নরম হয়ে যাওয়া মাটি এবং অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল মিলিয়ে শিবিরগুলোতে নতুন করে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা, আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি আবহাওয়া বার্তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে কাজের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সমন্বিত উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা
বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি), স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান, ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়ন এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও স্পষ্ট করেছে যে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শিবিরগুলোতে কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থসংকটে ব্যাহত প্রস্তুতি
রোহিঙ্গা শিবিরে চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় ২০২৬ সালের যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার (জেআরপি) জন্য আরও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার খাত এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪০ শতাংশ পেয়েছে। মোট ৩ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলারের চাহিদার বিপরীতে এখনও ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়া আশ্রয় ও ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা খাতের আবেদনও মাত্র ৪২ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে। এই খাতে এখনও ৭ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, ঢাল স্থিতিশীল করা, পানি নিষ্কাশন উন্নত করা, যাতায়াতের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত প্রকৌশল সহায়তা নিশ্চিত করতে দ্রুত অর্থায়ন অপরিহার্য।
আবহাওয়ার পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে স্থানীয় সতর্ক সংকেত ৩ বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। যদিও মৌসুমি লঘুচাপটি বাংলাদেশ থেকে সরে গেছে, এর প্রভাবে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এখনও বজায় আছে।
৭ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে, যা ভূমিধস ও স্থানীয় বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়া সমন্বয় প্ল্যাটফর্মের দৈনিক ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৬০টি ঘটনার মধ্যে ছিল ৮৩টি ঝড়ো হাওয়ার ঘটনা, ৫২টি ভূমিধস, ১৪টি বন্যা, তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা এবং দুটি অবকাঠামোগত ঝুঁকির ঘটনা।
শিবিরের বাইরে কক্সবাজার সদর উপজেলার সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বাড়ি চাপা পড়ে একজন স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















