ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারির দীর্ঘদিনের সংবাদমাধ্যমবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় ছিল ডেইলি মেইলের প্রকাশক অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের বিরুদ্ধে করা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলা। তবে লন্ডনের হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারক তাঁর সব দাবি খারিজ করে দেন। মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসে এক জটিল নেটওয়ার্কের চিত্র, যেখানে বিতর্কিত সাংবাদিক, ব্যক্তিগত গোয়েন্দা, আইনজীবী এবং গণমাধ্যম সংস্কারকর্মীদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় আসে।
বিতর্কিত সাংবাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য
এই মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্রদের একজন ছিলেন সাংবাদিক গ্রাহাম জনসন। একসময় ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতায় কাজ করা জনসন পরে ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারিতে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি সংবাদমাধ্যমের অনিয়ম নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং আইনি গবেষক হিসেবেও যুক্ত হন।
হ্যারির মামলায় জনসনের সংগ্রহ করা তথ্য ও এক ব্যক্তিগত গোয়েন্দার কথিত স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অভিযোগ ছিল, ডেইলি মেইলের জন্য কাজ করতে গিয়ে অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহ, ফোনে আড়ি পাতা এবং নজরদারি চালানো হয়েছিল।
দীর্ঘ শুনানি ও বিপুল ব্যয়
মামলাটি ৪৬ দিন ধরে চলে। এতে ৫২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্স হ্যারি, স্যার এলটন জন এবং আরও কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি। মামলার আইনি ব্যয় ৪ কোটি পাউন্ডেরও বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ডেইলি মেইলের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক সম্পাদক, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রতিবেদকরাও আদালতে সাক্ষ্য দেন।
হ্যাকড অফ ও আইনি প্রস্তুতির নেপথ্য
বিচার চলাকালে উঠে আসে সংবাদমাধ্যম সংস্কার আন্দোলন ‘হ্যাকড অফ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকাও। সাবেক রাজনীতিক ও সংগঠক ইভান হ্যারিস পরে সংবাদপত্রবিরোধী গোপনীয়তা সংক্রান্ত মামলাগুলোর গবেষণা ও প্রস্তুতিতে যুক্ত হন।
একই সময়ে গ্রাহাম জনসনও আইনজীবীদের গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল সম্ভাব্য সাক্ষী খুঁজে বের করা, সাংবাদিক ও ব্যক্তিগত গোয়েন্দাদের শনাক্ত করা এবং মামলার পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করা।

ব্যক্তিগত গোয়েন্দার বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
মামলার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল ব্যক্তিগত গোয়েন্দা গ্যাভিন বারোজকে ঘিরে। প্রথমদিকে তাঁর নামে জমা দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, তিনি অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের জন্য অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
কিন্তু পরে আদালতে প্রকাশিত অন্য বিবৃতিতে বারোজ সেই দাবি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ডেইলি মেইল বা মেইল অন সানডের জন্য তিনি কখনও অবৈধ তথ্য সংগ্রহ করেননি। বরং গ্রাহাম জনসনের সঙ্গে তাঁর আর্থিক চুক্তি ছিল এবং তাঁর আত্মজীবনীর স্বত্বও বিক্রি করেছিলেন।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে এবং আদালতে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ হয়।
হ্যারির সংবাদমাধ্যমবিরোধী লড়াই
প্রিন্স হ্যারি এর আগে ডেইলি মিররের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় আংশিক সাফল্য পান। সেখানে আদালত কয়েকটি প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে অবৈধ তথ্য সংগ্রহের প্রমাণ পেয়েছিল। পরে দ্য সান ও নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডের প্রকাশকের সঙ্গে তিনি আদালতের বাইরে সমঝোতায় পৌঁছান এবং ক্ষমা প্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ পান।
তবে অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের বিরুদ্ধে সর্বশেষ এই মামলায় আদালত তাঁর দাবিগুলো গ্রহণ করেননি। বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সাক্ষ্য প্রস্তুতির নানা দিক নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন ওঠে।
ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে এই মামলার রায় শুধু প্রিন্স হ্যারির আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ই নয়, বরং ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড সাংবাদিকতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককেও আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















