কোটি কোটি টাকা আয় করেও ব্যক্তিগত আয় কম দেখিয়ে করের বোঝা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন সিঙ্গাপুরের এক বেসরকারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। নিজের প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ব্যবহার করে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করলেও তা ব্যক্তিগত আয়ের পরিবর্তে করমুক্ত লভ্যাংশ ও ঋণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা কর কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে পারেনি।
সিঙ্গাপুরের আদালত ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কর কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ বহাল রেখেছে। এই রায় দেশটির উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কম বেতন দেখিয়ে কোটি টাকার অর্থ গ্রহণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই চিকিৎসক তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডলার বেতন নিতেন। কিন্তু একই সময়ে প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে গড়ে ২০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ বিভিন্ন উপায়ে গ্রহণ করেছেন।
তার দাবি ছিল, এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যক্তিগত আয় নয়। প্রতিষ্ঠান থেকে কর পরিশোধের পর পাওয়া লভ্যাংশ এবং অংশীদারের ঋণ হিসেবে তিনি এসব অর্থ নিয়েছেন। তাই ব্যক্তিগত আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে তা আলাদাভাবে দেখানোর প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেছিলেন।

কিন্তু সিঙ্গাপুরের কর কর্তৃপক্ষ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। তদন্তে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হলেও তার ঘোষিত বেতন ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম।
কর কর্তৃপক্ষের তদন্তে বেরিয়ে আসে তথ্য
সিঙ্গাপুরের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময়ের কর হিসাব পর্যালোচনা করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে। তদন্তে তারা দেখতে পায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের কর মূল্যায়ন সময়ের মধ্যে ওই চিকিৎসক তার প্রতিষ্ঠান থেকে ৯০ লাখ ডলারের বেশি লভ্যাংশ এবং প্রায় ৩০ লাখ ডলার সুদবিহীন ঋণ নিয়েছেন।
কর কর্তৃপক্ষ মনে করে, এসব অর্থ প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসকের নিজের পরিশ্রম ও পেশাগত আয়ের অংশ। তাই এগুলো ব্যক্তিগত আয় হিসেবে বিবেচনা করে অতিরিক্ত কর নির্ধারণ করা হয়।
আদালত বলল, আয় লুকানোর জন্য প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা যাবে না
চিকিৎসক কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেন। তবে আদালত তার আবেদন খারিজ করে দেয়।
আদালত জানায়, কোনো ব্যক্তি নিজের শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্জিত আয় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর করে ব্যক্তিগত করের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান মূলত ব্যবসার উন্নয়ন বা প্রকৃত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের পরিবর্তে শুধু কর কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা আইন অনুযায়ী বাতিল করা যেতে পারে।
সরকারি চাকরির বেতন ও প্রতিষ্ঠানের বেতনের পার্থক্য ছিল বড় প্রশ্ন
তদন্তে আরও উঠে আসে, ওই চিকিৎসক আগে সিঙ্গাপুরের একটি সরকারি হাসপাতালে কাজ করার সময় মাসে ৪৫ হাজার ডলারের বেশি বেতন পেতেন।
কিন্তু নিজের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান চালু করার পর তিনি নিজের জন্য মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার ডলার মাসিক বেতন নির্ধারণ করেন। প্রতিষ্ঠান লাভজনক হওয়ার পরও বেতন না বাড়িয়ে বড় অঙ্কের লভ্যাংশ ও ঋণের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি কর কর্তৃপক্ষের সন্দেহ বাড়ায়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এই ধরনের অস্বাভাবিক পার্থক্য দেখায় যে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কর কমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
ব্যবসার সুবিধা ব্যক্তিগত কর এড়ানোর উপায় নয়
সিঙ্গাপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন কর সুবিধা দেওয়া হয়। এসব সুবিধার উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন উদ্যোগ গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
তবে আদালত মনে করেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শুধু ব্যক্তিগত আয়কে কম করের আওতায় আনার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই সুবিধা আর প্রযোজ্য হবে না।
এই ঘটনায় কর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, খরচ এবং অর্থ গ্রহণের পদ্ধতি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু পরামর্শ নেওয়া দায়মুক্তির কারণ নয়
ওই চিকিৎসক দাবি করেছিলেন, তিনি হিসাবরক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন এবং কর সুবিধার বিষয়ে সব তথ্য জানতেন না।
তবে আদালত জানিয়েছে, করদাতার নিজের কর দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের আগে তার আইনি প্রভাব বোঝার দায়িত্বও করদাতার।
শুধু কোনো পেশাজীবীর পরামর্শ অনুসরণ করার কথা বলে কর সংক্রান্ত দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য বড় শিক্ষা
এই মামলার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের কর ব্যবস্থায় একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে—আয় গোপন বা কৃত্রিম কাঠামো তৈরি করে কর কমানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থার কারণে অস্বাভাবিক আয়, বেতন ও অর্থ লেনদেনের পার্থক্য সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।
সঠিকভাবে আয় ঘোষণা করা এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থা অনুসরণ করাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















