ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় শহর লা গুয়ারায় ভয়াবহ ভূমিকম্প শুধু হাজারো প্রাণই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করে দিয়েছে শত শত শিশুর স্বপ্নও। একসময় যে মাঠে প্রতিদিন বেসবলের উচ্ছ্বাসে মুখর থাকত শহর, সেখানে এখন আশ্রয় নিয়েছে ঘরহারা পরিবার। অনেক শিশু আহত, অনেকেই বাবা-মাকে হারিয়েছে, আবার অনেকে এখনও নিখোঁজ। এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শিশু বেসবল লিগের ওপর।
ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে গেছে ভবিষ্যতের তারকারা
ভূমিকম্প থামার পরপরই কোচদের কাছে একের পর এক নিখোঁজ শিশুদের খবর আসতে শুরু করে। অনেক খেলোয়াড়কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, কেউ কেউ এতিম হয়ে পড়েছে।
১২ বছর বয়সী প্রতিভাবান খেলোয়াড় স্যামুয়েল ব্রিতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার হলেও তার বাবা-মা প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র চার বছরের ফ্রাঙ্কো গুতিয়েরেসকে তার মায়ের সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ছয় বছরের হিরাম ভিয়ারোয়েল এখনও নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
শিশুদের স্বপ্নের ঠিকানায় নেমেছে নীরবতা

লা গুয়ারায় চার থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৬০০ শিশু দেশের ঐতিহ্যবাহী শিশু বেসবল লিগে খেলত। এই লিগ বহু বছর ধরে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখার একটি বড় সুযোগ হিসেবে পরিচিত।
একসময় যেখানে প্রতিদিন অনুশীলন আর প্রতিযোগিতার ব্যস্ততা ছিল, এখন সেই মাঠগুলো পরিণত হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। তাঁবুর ফাঁকে ফাঁকে কিছু শিশু এখনও বল আর ব্যাট হাতে খেলতে চেষ্টা করছে, যদিও তারা জানে না তাদের অনেক সতীর্থ আর কখনও মাঠে ফিরবে কি না।
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও অসম্পূর্ণ
লিগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কতজন শিশু খেলোয়াড় প্রাণ হারিয়েছে, সেই সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হবে না।
তবে নিশ্চিতভাবে বহু শিশু খেলোয়াড়, কোচ ও পরিবারের সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে অনেক পরিবার শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে, যা ভবিষ্যতে শিশু বেসবলের ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসবল ছিল দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার আশা

ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শিশু বেসবল লিগ ভেনেজুয়েলার হাজারো শিশুর কাছে শুধু একটি খেলার মঞ্চ নয়, বরং জীবনের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কয়েক হাজার দলে প্রায় ৪০ হাজার শিশু এই লিগে খেলছে।
এখানে খেলেই অনেক শিশু বড় হয়ে পেশাদার বেসবলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। যদিও সবাই সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না, তবু খেলাধুলার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাই লিগটির অন্যতম লক্ষ্য।
স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই
১২ বছর বয়সী ইয়েফারসন সেইহাসের পরিবার ভূমিকম্পে সবকিছু হারিয়েছে। তবু তারা শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কারণ পরিবারের বিশ্বাস, ছেলের বেসবল ক্যারিয়ারই হয়তো একদিন তাদের নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে।
এদিকে অসংখ্য শিশুর হাতে এখন আর ব্যাট, গ্লাভস বা ইউনিফর্ম নেই। মাঠও নেই আগের মতো। তাই পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন করে শিশুদের খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূমিকম্প শুধু ভবন ধ্বংস করেনি, কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য শিশুর স্বপ্ন, পরিবার ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। তবুও যারা বেঁচে আছে, তাদের চোখে এখনও একদিন আবার মাঠে ফেরার ক্ষীণ আশার আলো জ্বলছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















