আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ নতুন কিছু নয়। তবে এবার সেই ভালোবাসারই এক অনন্য প্রতীক হয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে প্যাটাগোনিয়ার কুত্রাল কো শহরে নির্মিত ২৬ মিটার উঁচু একটি বিশাল ভাস্কর্য। এটি বর্তমানে মেসিকে উৎসর্গ করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্মারক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
নতুন এই ভাস্কর্যে দেখা যায়, হাঁটু গেড়ে বসা মেসি এক হাতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি ধরে আছেন, আর অন্য হাত আকাশের দিকে তুলে যেন নিজের সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। পুরো ভাস্কর্যটি সাদা রঙে রাঙানো হলেও আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি এবং সোনালি বুট আলাদা করে নজর কাড়ে।
বিশ্বকাপের প্রতীকী উপস্থাপন
মেসির দুই পায়ের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ, যা ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের স্মারক। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, মেসির হাতে উঁচু করে ধরা থাকবে ট্রফিটি। কিন্তু প্যাটাগোনিয়ার প্রবল বাতাসের কারণে সেই নকশা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভিন্ন স্থানে ট্রফি বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা ও রসিকতার জন্ম দেয়।
তবে এই ভাস্কর্য শুধু আলোচনার বিষয় নয়, এটি দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময়ের শ্রমের ফল। স্থানীয় শিল্পী আলদো বেরোইসা এবং কুত্রাল কো শহরের বাসিন্দারা একযোগে কাজ করে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এটি নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তাদের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও স্থান পায়।
জয়ের আনন্দের নতুন ঠিকানা
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় জয় পেয়ে শেষ আটে পৌঁছানোর পর এই ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জাতীয় দলের সাফল্য উদযাপন করেন। ফলে এটি এখন শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, বরং শহরের মানুষের মিলনস্থল এবং ফুটবল উদযাপনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।
উচ্চতার দিক থেকেও এই স্মারক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভারতের ২১ মিটার উঁচু মেসি ভাস্কর্যের চেয়ে এটি পাঁচ মিটার বেশি উঁচু।

খোলা আকাশের নিচে ভাস্কর্যের জগৎ
কুত্রাল কো এবং পাশের প্লাজা হুইনকুল শহর শুধু মেসির ভাস্কর্যের জন্যই পরিচিত নয়। ন্যাশনাল রুট ২২ ধরে এগোলে প্যাটাগোনিয়ার মরুভূমির একঘেয়েমির মাঝে চোখে পড়ে বিশাল আকারের অসংখ্য ভাস্কর্য। ধর্মীয় প্রতীক থেকে শুরু করে ডাইনোসরের প্রতিরূপ—সব মিলিয়ে এলাকাটি যেন একটি উন্মুক্ত ভাস্কর্য জাদুঘর।
এই সবকিছুর পেছনের মানুষ আলদো বেরোইসা। গভীর ধর্মবিশ্বাসী এই শিল্পী ১৯ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। তাঁর বিশ্বাস, সেই দুর্ঘটনায় যিশু খ্রিস্টের কৃপায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তী সময়ে তাঁর বহু ভাস্কর্যে সাদা পোশাক পরিহিত ধর্মীয় প্রতীক ফুটে উঠেছে।
বেরোইসার নির্মিত উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৩ মিটার উঁচু যিশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর বিশাল প্রতিরূপ, ১৯৮২ সালের মালভিনাস যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সেনাদের স্মারক, ১৯৭৬ সালের বিমান দুর্ঘটনার নিহতদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য এবং নারীদের সম্মানে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম। এছাড়া প্লাজা হুইনকুলে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় দুটি বিশাল ডাইনোসরের ভাস্কর্যও।
এ পর্যন্ত প্যাটাগোনিয়ার বিভিন্ন শহরে তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য ও স্মারকের সংখ্যা ৪৫টিরও বেশি। সবগুলোই স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। নিজের শিল্পচর্চা সম্পর্কে বেরোইসার মন্তব্য, “এই সড়কই আমার শিল্পগ্যালারি।”
প্যাটাগোনিয়ার এই বিশাল মেসি ভাস্কর্য এখন শুধু একজন ফুটবলারের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি, শিল্প ও জাতীয় গর্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
প্যাটাগোনিয়ায় ২৬ মিটার উঁচু মেসির ভাস্কর্য বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। স্থানীয় শিল্পীর এক বছরের শ্রমে তৈরি এই স্মারক এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল উদযাপনের কেন্দ্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















