বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সব পরাশক্তির বিপক্ষেই খেলেছেন এবং জয়ের স্বাদ পেয়েছেন লিওনেল মেসি। কিন্তু একটি নাম এতদিন বাদই ছিল—ইংল্যান্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। বুধবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে মাঠে নামবেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, যা তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গভীরতা থাকলেও মেসির ক্যারিয়ারে এই লড়াইয়ের অভাব ছিল। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—এই দুই গোলের পর থেকেই আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়।
বিশ্বকাপে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা
সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর মেসি বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কখনও খেলার সুযোগ হয়নি। তাঁর ভাষায়, ইংল্যান্ড একটি শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী দল, আর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে তাদের বিপক্ষে খেলতে পারা বিশেষ অনুভূতির।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড সর্বশেষ বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। সেই ম্যাচে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। তখন মেসির বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অভিষেকও হয়নি।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে মেসির পথচলা
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেকের পর মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রায় সব দেশের বিপক্ষেই খেলেছেন। জার্মানি, ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স, উরুগুয়ে ও স্পেনের বিপক্ষে তাঁর স্মরণীয় জয় রয়েছে।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা এসেছে জার্মানির বিপক্ষে। ২০০৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১০ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। পরে অবশ্য প্রীতি ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে দুটি জয় তুলে নেয় মেসির দল।
স্পেনের বিপক্ষে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে শুধু প্রীতি ম্যাচে, যেখানে দুই দলই একটি করে জয় পেয়েছে।

স্মরণীয় জয়ের তালিকা
মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতে। একই বছরে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমাও জিতে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষেও রয়েছে দুটি ঐতিহাসিক জয়। ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে মেসি জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জেতেন। এরপর ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলকে তাদের মাঠে ১-০ গোলে হারিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার বাছাই ইতিহাসে ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের ঘরের মাঠের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে দেয় আর্জেন্টিনা।
উরুগুয়ের বিপক্ষেও মেসির রেকর্ড ইতিবাচক। ১৩ ম্যাচে তিনি পেয়েছেন আটটি জয়, তিনটি ড্র ও দুটি হার। তবে ২০১১ কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা
হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের ইংল্যান্ডকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ইউরোপের কোনো বড় দলের বিপক্ষে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেনি আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও কোপা আমেরিকায় তারা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর মুখোমুখি হয়েছে এবং প্রীতি ম্যাচ খেলেছে তুলনামূলক কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কঠিন পথ পেরিয়ে শেষ চারে উঠেছে। দলের ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক মেসি এখন পর্যন্ত আট গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় রয়েছেন।
সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি বলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও একই মান ধরে রেখে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যাওয়া সহজ নয়। তবে এই দল সেটিই করে চলেছে।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই প্রথম লড়াই তাই শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি বহুল প্রতীক্ষিত অধ্যায়েরও সূচনা।
বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি মেসি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাকি থাকা একমাত্র বড় ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ তৈরি হলো ২০২৬ বিশ্বকাপে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















