বিশ্বজুড়ে বৈষম্য নিয়ে যত বড় বড় গবেষণা, প্রতিবেদন ও নীতিগত আলোচনা হয়, তার বেশিরভাগই আয়, মজুরি এবং শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে। নারী-পুরুষের বৈষম্যও সাধারণত পরিমাপ করা হয় কর্মসংস্থান, বেতন কিংবা শ্রমে অংশগ্রহণের সূচকে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতার আরেকটি মৌলিক ভিত্তি—সম্পদ বা সম্পত্তির মালিকানা—প্রায় সম্পূর্ণভাবে আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ফলে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থার যে বাস্তব চিত্র, তার একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব বৈষম্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোও একই সীমাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি করেছে। সেখানে নারীর শ্রমবাজারে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও নারীর সম্পদ, জমি, উত্তরাধিকার বা উৎপাদনশীল সম্পত্তির মালিকানা কার্যত আলোচিত হয়নি। অথচ অর্থনৈতিক বৈষম্য বোঝার জন্য এই প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় হওয়া উচিত। কারণ সম্পদ কেবল আয়ের উৎস নয়; এটি ক্ষমতা, নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিও।
দীর্ঘদিন ধরে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে গবেষণার একটি বড় অংশ শ্রমবাজারকেই প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যেন নারীর অর্থনৈতিক পরিচয় কেবল শ্রম বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর বহু দেশে, বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণে, সম্পদের মালিকানা নারী-পুরুষের বৈষম্য নির্ধারণে আরও গভীর ভূমিকা রাখে।
নারীর নামে জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো স্থায়ী সম্পদ থাকলে তার প্রভাব শুধু তার নিজের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। বহু দশকের আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখিয়েছে, মায়ের সম্পদের মালিকানা থাকলে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। একই সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে গেলে নারীর দারিদ্র্যে পড়ার ঝুঁকি কমে এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে তার অবস্থানও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়। অর্থাৎ সম্পদ সামাজিক নিরাপত্তারও একটি কার্যকর ভিত্তি।

উৎপাদনশীল সম্পদের মালিকানা অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমি, সেচ, যন্ত্রপাতি কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণে নারীর প্রবেশাধিকার বাড়লে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়—এমন প্রমাণ বহু গবেষণায় রয়েছে। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেক দেশেই ব্যাপক, কিন্তু মালিকানা সীমিত। ফলে তাদের শ্রম ব্যবহৃত হলেও উৎপাদনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
ভারতের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গ্রামীণ নারীদের বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং তাদের অধিকাংশই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। আবার বিপুলসংখ্যক নারী স্বনিয়োজিত হিসেবে পারিবারিক খামার, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা রাস্তার ক্ষুদ্র বাণিজ্যে অবৈতনিক বা স্বল্প আয়ের শ্রম দেন। এই বাস্তবতায় নিয়মিত বেতনের চাকরি নারীদের প্রধান আয়ের উৎস নয়। তাই তাদের জন্য জমি, দোকান, গাড়ি, কৃষিযন্ত্র বা অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদের মালিকানাই টেকসই আয়ের ভিত্তি।
কিন্তু বাস্তবে সম্পদের মালিকানায় নারীরা এখনও মারাত্মকভাবে পিছিয়ে। ভারতের বিভিন্ন জরিপ ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে, গ্রামীণ ভূমির মালিক পরিবারগুলোর অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রেই নারীর নামে জমি রয়েছে। অথচ পুরুষেরা শহরে বা কৃষির বাইরে কাজে চলে যাওয়ায় বহু নারী কার্যত কৃষিকাজ পরিচালনা করেন। তারা কৃষক হিসেবে কাজ করলেও কৃষিজমির মালিক নন। ফলে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতা তাদের হাতে আসে না।
এই বাস্তবতার পরও আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিবেদন নারীর অর্থনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নে ঘণ্টাপ্রতি আয়কে প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পদ্ধতিরও স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘণ্টাভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন না। একজন কৃষক, দোকানদার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়কে ঘণ্টা ধরে নির্ভুলভাবে হিসাব করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে স্বনিয়োজিত মানুষের ক্ষেত্রে এই পরিমাপ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বার্ষিক আয় বা মোট উপার্জনের মতো সূচক তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, নারীর অবৈতনিক শ্রমের সংজ্ঞাকে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে দেখা। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে অবৈতনিক শ্রম বলতে মূলত গৃহস্থালির কাজকে বোঝানো হয়। কিন্তু পারিবারিক কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে নারীরা যে বিপুল পরিমাণ বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেন, সেটি প্রায়ই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। ফলে অর্থনীতিতে তাদের প্রকৃত অবদানও অদৃশ্য হয়ে পড়ে।

নারীদের কম কর্মসংস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাধারণত শিশু পরিচর্যা, নিরাপদ পরিবহন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা কিংবা নিয়োগ বৈষম্যের মতো কারণ উল্লেখ করা হয়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পদের মালিকানা না থাকার বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অথচ গবেষণাই বলছে, সম্পদ বৈষম্যের সবচেয়ে বড় উৎস অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরাধিকার। যদি সম্পদের সিংহভাগ পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে শ্রমবাজারে সমতা এলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য পুরোপুরি দূর হবে না।
অনেকে যুক্তি দেন, সম্পদে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য পরিমাপের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য নেই। কিন্তু এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে পেনশনভিত্তিক সম্পদ বা উচ্চসম্পদশালীদের লিঙ্গভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়। আবার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় জমির মালিকানার তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যেই এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা তৈরি করেছে। তথ্য অসম্পূর্ণ হলেও বৈষম্যের একটি বাস্তব চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব।
বিশ্বব্যাপী সম্পদ বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তাহলে পরিবারভিত্তিক সম্পদ বৈষম্যের পাশাপাশি নারী-পুরুষের সম্পদ বৈষম্যকেও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। তবে এই দুই ধরনের বৈষম্য মোকাবিলার নীতি এক হতে পারে না। কারণ লিঙ্গভিত্তিক সম্পদ বৈষম্যের ক্ষেত্রে একই পরিবারের ভেতরেও ক্ষমতা ও মালিকানার অসাম্য বিদ্যমান থাকে, যা আলাদা নীতিগত মনোযোগ দাবি করে।
নারীর অর্থনৈতিক অবস্থানকে শুধু শ্রমবাজারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখার অর্থ হলো এমন একটি বিশ্বকে মেনে নেওয়া, যেখানে মূলধনের মালিক প্রধানত পুরুষ এবং নারীর ভূমিকা কেবল শ্রম বিক্রেতার। একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ধারণা শুধু অসম্পূর্ণ নয়, বরং বৈষম্যের প্রকৃত চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রেও গভীর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই ন্যায্য অর্থনীতি গড়তে হলে নারীর শ্রমের পাশাপাশি সম্পদের মালিকানাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিনা আগরওয়াল 



















