মাটির গভীর থেকে আকাশের অসীম সৌন্দর্য অনুভব করার এক অভিনব সুযোগ তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পী জেমস টারেল। ডেনমার্কের আরহুস শহরের আরওএস জাদুঘরে চালু হয়েছে তার শততম আলো-আকাশের স্থাপনা, যার নাম ‘অ্যাস সিন বিলো — দ্য ডোম’। আলো, স্থাপত্য ও মানুষের অনুভূতিকে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি এই শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের জন্য এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে।
মাটির নিচে তৈরি আকাশ দেখার ঘর
স্থাপনাটিতে প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের জাদুঘরের মূল ভবন থেকে বাঁকানো একটি পথ ধরে নিচে নামতে হয়। এরপর তারা পৌঁছান বিশাল গোলাকার এক কক্ষে, যার ওপরে রয়েছে গম্বুজ। গম্বুজের মাঝখানে থাকা ছোট গোলাকার খোলা অংশ দিয়ে দেখা যায় আকাশের এক অন্য রূপ।
প্রাকৃতিক আলো ও এক হাজারের বেশি কৃত্রিম আলোর সমন্বয়ে সেখানে তৈরি হয় নানা রঙের পরিবর্তনশীল দৃশ্য। কখনো আকাশ নীল, কখনো সবুজাভ, আবার কখনো হলুদের উজ্জ্বল ছায়ায় দেখা দেয়। এই পরিবর্তন দর্শকদের আলোকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ দেয়।
দীর্ঘ পরিকল্পনার পর বাস্তব হলো স্বপ্ন
সারাক্ষণ রিপোর্ট জানায়, এই বিশেষ স্থাপনাটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় ১২ বছর। জায়গার বিশেষ বৈশিষ্ট্য, নির্মাণ অনুমতি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে কাজ এগিয়ে নিতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
শুরুতে পুরো কাঠামো মাটির নিচে গোলাকারভাবে তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে ব্যয়ের কারণে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়। পরে বিশাল গম্বুজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর জন্য বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে বড় আকারের তন্তু কাঠামো, যার ভেতরের অংশ মসৃণ করতে হাতে কাজ করা হয়েছে।
আলো নিয়ে শিল্পীর দীর্ঘ অনুসন্ধান
জেমস টারেলের শিল্পজীবনের মূল বিষয় হলো আলো। তার মতে, আলো শুধু কোনো কিছুকে দেখার মাধ্যম নয়, বরং নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে তিনি আলো ও মানুষের উপলব্ধির সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন।
ডেনমার্কে এই স্থাপনা তৈরির পেছনে দেশটির আলোর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ শীতের কারণে সেখানে আলো কম থাকায় মানুষ আলোকে বিশেষভাবে মূল্য দেয় বলে মনে করেন টারেল।
নীরবতা ও আত্মঅনুসন্ধানের জায়গা
এই স্থাপনাটি শুধু বড় আকারের একটি স্থাপত্য নয়, এটি মানুষের ভেতরের অনুভূতি জাগানোর একটি স্থানও। এখানে বসার জন্য গোলাকার বেঞ্চ রাখা হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা নীরবে বসে আলো ও আকাশের পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন।
টারেলের বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো করে এই অভিজ্ঞতার অর্থ খুঁজে নিতে পারেন। এর জন্য শিল্প সম্পর্কে আগে থেকে কোনো বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন নেই।
আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরে ফেরার অভিজ্ঞতা
আরওএস জাদুঘরের পরিচালক রেবেকা ম্যাথিউজ এই স্থাপনাকে একসঙ্গে আশ্রয়, পর্যবেক্ষণ স্থান, স্থাপত্য ও অনুভূতিনির্ভর শিল্প হিসেবে দেখছেন। তার মতে, দর্শনার্থীরা এখানে নিজেদের মতো করে আলোকে অনুভব করার সুযোগ পাবেন।
৮৩ বছর বয়সী টারেলের জন্য আলো এখনো রহস্যময় এক বিষয়। তবে নিজের আলো-অনুসন্ধানের পথেই তিনি অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এসে ত্বকের ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন। তবুও আলো নিয়ে তার অনুসন্ধান থেমে নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















