বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি লড়াইকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে বিশ্বের অন্যতম তীব্র ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তবে এই বৈরিতার শিকড় শুধু ফুটবলে নয়; ঔপনিবেশিক ইতিহাস, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাস অনেক গভীর ও জটিল।
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাকে দেশের মানুষের জন্য বিশেষ গুরুত্বের বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ আর্জেন্টিনার জন্য কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ঐতিহাসিক স্মৃতিরও অংশ।
ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনা সাধারণত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনের বিতর্কিত বহিষ্কার, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল কিংবা ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ডের ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে।
কিন্তু এই সম্পর্কের ইতিহাস আরও পুরোনো। দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনীয় উপনিবেশ স্থাপনের সময় থেকেই ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হতো। সেই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব আজও আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাষ্যে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রিটিশদের ‘দস্যু’ বলে সমালোচনা করার প্রবণতাও সেই অতীতেরই প্রতিফলন।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রভাব
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায় ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। আর্জেন্টিনায় দ্বীপপুঞ্জটি ‘ইসলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত এবং দেশটির দাবি এখনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের সময় আর্জেন্টিনার বিভিন্ন সাময়িকীতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে জলদস্যুর রূপে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আজও দেশের বিভিন্ন শহরে মালভিনাসের দাবিকে কেন্দ্র করে পোস্টার ও বিলবোর্ড দেখা যায়।
তবে লেখকের মতে, এই বৈরিতা অনেকাংশে আর্জেন্টিনার দিক থেকেই বেশি তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে, কারণ ব্রিটেনে একই মাত্রায় এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো জনস্মৃতিতে স্থান পায়নি।
১৮০৬–০৭ সালের ব্রিটিশ অভিযান
নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ বাহিনী রিও দে লা প্লাতা অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে বর্তমান বুয়েনস আইরেস দখলের চেষ্টা করে। উভয় প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
তৎকালীন বুয়েনস আইরেসের মানুষের কাছে এই প্রতিরোধ জাতীয় ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হলেও ব্রিটেনে ঘটনাটি তুলনামূলকভাবে বিস্মৃত। ওই সংঘর্ষের স্মৃতি হিসেবে এখনো একটি কনভেন্টের দেয়ালে গুলির চিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে।
বৈরিতার পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল
দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সংঘাতের ছিল না। স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ব্রিটেন আর্জেন্টিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ ব্যাংকগুলো অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে, ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা রেলপথ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন এবং ব্রিটিশ বাজারে আর্জেন্টিনার গরুর মাংস বড় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়।
একই সঙ্গে ব্রিটিশ অভিবাসীরা আর্জেন্টিনায় রাগবি, পোলো ও ফুটবলের মতো খেলার প্রচলন ঘটান। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ দুই ভাই থমাস ও জেমস হগ ফুটবলকে সংগঠিতভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। পরবর্তীতে এই খেলাই আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
রাজনীতি কীভাবে বৈরিতা বাড়িয়েছে
বিশ শতকের প্রথমার্ধে অর্থনৈতিক অবনতির পর আর্জেন্টিনায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদ আরও জোরালো হয়। প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরনের শাসনামলে ফকল্যান্ড নিয়ে জাতীয় দাবিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয় এবং বুয়েনস আইরেসে এ-সংক্রান্ত প্রচারণা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

লেখকের মতে, পরবর্তী সামরিক জান্তার ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড অভিযান সরাসরি পেরনের নীতির ফল বলা না গেলেও, সেই রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল।
ফুটবলই শেষ কথা
সব রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তেজনার মধ্যেও লেখক মনে করিয়ে দেন, আর্জেন্টিনা একমাত্র জাতীয়তাবাদী আবেগের দেশ নয়। দেশটির সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস ব্রিটিশ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশংসা করতেন।
বর্তমান আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও ম্যাচটিকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক রূপ না দিয়ে বলেছেন, এটি শেষ পর্যন্ত একটি ফুটবল ম্যাচই। তাঁর ভাষায়, “এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, এর বেশি কিছু নয়।”
বিশ্বকাপের এই লড়াই তাই শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; দুই শতকের ইতিহাস, স্মৃতি, সংঘাত এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দীর্ঘ যাত্রারও প্রতিফলন।
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ দ্বৈরথের পেছনের ইতিহাস, ফকল্যান্ড যুদ্ধ ও দুই দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















