তামিলনাড়ুতে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে বড় পরিবর্তন আনল সুপ্রিম কোর্ট। হাইকোর্টের দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আদেশের ওপর আপাতত স্থগিতাদেশ জারি করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে তামিলনাড়ুতে গরু জবাই সংক্রান্ত আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে।
সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ তামিলনাড়ু সরকারের করা আবেদনের শুনানি করে এই নির্দেশ দেয়। আদালত জানিয়েছে, হাইকোর্টের রায়ের শেষ অংশে যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে, সেটি প্রাথমিকভাবে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে বদলে গেল পরিস্থিতি
মাদ্রাজ হাইকোর্ট গত ২৭ মে এক রায়ে তামিলনাড়ু সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল, রাজ্যে কোনো গরু বা বাছুর যেন জবাই করা না হয়। এই নির্দেশের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে।
শুনানির সময় সর্বোচ্চ আদালত জানায়, বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তাই হাইকোর্টের নির্দেশের কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত আগের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে না।
রাজ্যের দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশ আইনের সীমা ছাড়িয়েছে
তামিলনাড়ু সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, মাদ্রাজ হাইকোর্ট যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজ্যের বক্তব্য, মূল মামলায় প্রশ্ন ছিল নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় গরু বা বাছুর উৎসর্গ করা যাবে কি না। কিন্তু সেই সীমিত বিষয়ের বাইরে গিয়ে হাইকোর্ট রাজ্যজুড়ে সব ধরনের গরু জবাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, তামিলনাড়ু প্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ১০ বছরের বেশি বয়সী এবং কাজ বা প্রজননের জন্য অযোগ্য গরু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে। তাই পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করলে এই আইনের নির্ধারিত বিধান কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে।

আইন নিয়ে রাজ্য সরকারের ব্যাখ্যা
তামিলনাড়ু সরকার আদালতে যুক্তি দেয়, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন, কসাইখানা সংক্রান্ত নিয়ম এবং স্থানীয় প্রশাসনিক আইনগুলো কোথাও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলে না।
সরকারের দাবি, এসব আইনে মূলত নির্দিষ্ট নিয়ম, স্বাস্থ্যবিধি এবং প্রশাসনিক শর্ত মেনে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তাই হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে রাজ্য সরকার “বিচারিকভাবে নতুন আইন তৈরির মতো” বলে উল্লেখ করেছে।
ধর্মীয় আচার ও জনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক
এই মামলার সূত্রপাত হয় কোয়েম্বাটোরের বাসিন্দা কে সূর্য প্রসান্তের আবেদনের মাধ্যমে। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে ধর্মীয় আচার পালনের জন্য গরু জবাইয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এরপর তামিলনাড়ু পুলিশ আদালতে জানায়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছিল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ জানায়, নির্ধারিত স্থানটি জনসাধারণের চলাচলের বাইরে রাখা হয়েছিল এবং এমনভাবে ব্যবস্থা করা হয়েছিল যাতে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে কী বলা হয়েছিল
এর আগে মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন ও বিচারপতি ভি লক্ষ্মীনারায়ণনের বেঞ্চ সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেছিল, গরু, বাছুর এবং দুধ বা কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদিপশু রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
হাইকোর্ট তামিলনাড়ু প্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮-এর ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিল, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হলে গরু জবাই করা যাবে না। আদালত মনে করেছিল, গবাদিপশু সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এখন নজর সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ে
সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের পর তামিলনাড়ুতে গরু জবাই সংক্রান্ত বিতর্ক আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে রাজ্য সরকার বিদ্যমান আইনের সীমার কথা বলছে, অন্যদিকে গবাদিপশু সংরক্ষণের বিষয়টি সামনে রেখে আগের রায়ের পক্ষে অবস্থান রয়েছে।
এখন এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায়ই নির্ধারণ করবে তামিলনাড়ুতে গরু জবাই সংক্রান্ত নিয়ম কোন পথে এগোবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















