পাকিস্তানে নতুন করে শুরু হওয়া বহিষ্কার অভিযানের মুখে হাজার হাজার আফগান পরিবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে আফগানিস্তানে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের দেশ ছাড়ার জন্য ইসলামাবাদ ১০ জুলাই পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সীমান্ত এলাকায় প্রতিদিন শত শত পরিবার আফগানিস্তানের দিকে রওনা দিচ্ছে।
সীমান্তে বাড়ছে ফিরতি মানুষের ঢল
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের প্রধান প্রবেশপথ তোরখাম দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৬০০ পরিবার আফগানিস্তানে প্রবেশ করছে। সীমান্ত এলাকায় স্বেচ্ছাসেবীরা খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা দিয়ে এসব পরিবারকে সহযোগিতা করছেন।
স্বেচ্ছাসেবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিরে যাওয়া অনেক পরিবারের কাছেই জাতিসংঘ প্রদত্ত নিবন্ধনপত্র রয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকার এখন জানিয়েছে, কেবল বৈধ ভিসাধারী—যেমন ছাত্র, ব্যবসা বা ভিজিট ভিসা—আফগানরাই দেশটিতে থাকতে পারবেন। আগে স্বীকৃত আফগান সিটিজেন কার্ড (ACC) ও প্রুফ অব রেজিস্ট্রেশন (PoR) কার্ডের বৈধতাও বাতিল করা হয়েছে।

অপরিচিত দেশে ফিরতে বাধ্য বহু পরিবার
সীমান্তের হামজা বাবা ট্রানজিট সেন্টারে অপেক্ষমাণ অনেক পরিবারের মতো জিয়া রহমানও পাকিস্তানেই জন্মেছেন। তাঁর দাবি, তিনি এবং তাঁর বড় ভাইয়েরা কখনো আফগানিস্তানে বসবাস করেননি। তাঁদের সন্তানদেরও আফগানিস্তানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই।
তাঁদের আশঙ্কা, নতুন দেশে গিয়ে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন, সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে—এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। বহু পরিবারই এমন এক দেশে ফিরছেন, যাকে তারা কার্যত চেনেন না।
দীর্ঘদিনের শরণার্থী সংকট
দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে লাখো আফগান পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন। ২০২১ সালে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে পাকিস্তানের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ নিবন্ধিত আফগান ছিলেন। এরপর আরও পাঁচ লাখের বেশি আফগান পাকিস্তানে আশ্রয় নেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামাবাদ ও তালেবান সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পাকিস্তান অভিযোগ করে, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানি তালেবান সদস্যরা আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। যদিও আফগান তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় বহিষ্কার নীতি আরও কঠোর করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান ২৫ লাখের বেশি আফগানকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
মানবিক সংকট আরও গভীর
বৃহৎ পরিসরে আফগানদের প্রত্যাবাসনের ফলে আফগানিস্তারের সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবিক সংকটও তীব্র হয়েছে। স্থানীয় অবকাঠামো বিপুল সংখ্যক ফিরতি মানুষকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
অনেক আফগান জানিয়েছেন, পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার এড়াতে তারা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন এবং সম্পত্তি খুব কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ১০ জুলাইয়ের পর থেকে পুলিশি তল্লাশি আরও ঘন ঘন হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী স্থানীয় লোকজনকে দোকান পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে নিজেরা আড়ালে থাকছেন।
পেশোয়ারের বোর্ড বাজার, যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার আফগান মালিকানাধীন ব্যবসা রয়েছে, সেখানেও এখন ক্রেতাদের পাশাপাশি নিয়মিত পুলিশি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বহু উদ্যোক্তা বলছেন, কয়েক দশকের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা ছেড়ে যেতে হচ্ছে, অথচ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
পাকিস্তানের এই নতুন বহিষ্কার অভিযান শুধু হাজার হাজার আফগান পরিবারের জীবনকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেনি, বরং আফগানিস্তানের সীমিত সক্ষমতার ওপরও নতুন মানবিক চাপ তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















