কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু ভাষা তৈরি, ছবি আঁকা কিংবা সফটওয়্যার লেখার প্রযুক্তি নয়। এটি ধীরে ধীরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাগারেও গুরুত্বপূর্ণ সহকারী হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। সম্প্রতি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি এআই-নির্ভর একটি টিকা প্রথমবারের মতো মানুষের ওপর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ঘটনাটি প্রযুক্তিগতভাবে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে যুগান্তকারী সাফল্য বলে ঘোষণা করার আগে বিজ্ঞানের স্বাভাবিক সতর্কতাও সমানভাবে প্রয়োজন।
এই গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, টিকাটি কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যমান ভাইরাসকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি। বরং একই পরিবারের একাধিক করোনাভাইরাস বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্য দীর্ঘমেয়াদে অপরিবর্তিত থাকে, সেগুলোকে কেন্দ্র করে একটি কৃত্রিম অ্যান্টিজেন তৈরি করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই পরিবারের নতুন ভাইরাস বা নতুন রূপ দেখা দিলেও শরীর যেন আগেভাগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। ভাইরাস যখন দ্রুত রূপ বদলায়, তখন প্রচলিত পদ্ধতিতে নতুন টিকা তৈরি ও বিতরণ করতে সময় লেগে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানীরা এখন এমন টিকার ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, যা প্রতিটি নতুন ভ্যারিয়েন্টের জন্য আলাদা করে তৈরি করতে হবে না। এআই এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও আরও বিশ্লেষণনির্ভর করে তুলতে পারে।
তবে এখানেই বাস্তবতার প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার প্রথম ধাপে মাত্র ৩৯ জন মানুষের ওপর এই টিকার নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে। এ ধরনের প্রাথমিক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য কার্যকারিতা প্রমাণ করা নয়; বরং নিশ্চিত হওয়া যে টিকাটি মানুষের জন্য নিরাপদ কি না এবং গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে কি না। সেই অর্থে পরীক্ষাটি সফল হলেও এটিকে কার্যকর সর্বজনীন করোনাভাইরাস টিকার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে প্রায় ২০০ জনের ওপর পরীক্ষা চলছে। সেখানেই বোঝা যাবে টিকাটি কতটা শক্তিশালী, কতদিন স্থায়ী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে এবং ভিন্ন ভিন্ন বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাসম্পন্ন মানুষের মধ্যে একইভাবে কাজ করে কি না। পরীক্ষাগারের সাফল্য এবং বাস্তব জীবনের সুরক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান অনেক সময়ই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
এআই নিয়ে জনমনে যে ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, এই গবেষণা সেটিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। অনেকের ধারণা, এআই যেন নিজেই বসে নতুন টিকা আবিষ্কার করছে। বাস্তবতা অবশ্য অনেক বেশি সংযত। এখানে এআই মূলত বিশাল পরিমাণ জৈবতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করেছে। এরপরও প্রতিটি ধাপ—গবেষণাগার পরীক্ষা, প্রাণীর ওপর পরীক্ষা এবং মানুষের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল—বিজ্ঞানীদের প্রচলিত পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করতে হয়েছে।
অর্থাৎ এটি মানুষের বিকল্প কোনো স্বয়ংক্রিয় আবিষ্কারক নয়; বরং গবেষকদের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বিশ্লেষণী সরঞ্জাম। শেষ সিদ্ধান্ত সবসময়ই পরীক্ষণ ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করে, অ্যালগরিদমের ওপর নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের যেকোনো অজানা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আগাম টিকা তৈরি করতে পারবে—এমন দাবি এখনই করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এআই এমন ভাইরাস পরিবারের মধ্যে মিল খুঁজে বের করতে পারে, যাদের সম্পর্কে ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। ফলে করোনাভাইরাস পরিবারের ভবিষ্যৎ সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সুরক্ষা তৈরি করা বাস্তবসম্মত হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ও অচেনা কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে নিশ্চিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা এই প্রযুক্তির নেই।

তবু এই সীমাবদ্ধতা গবেষণাটির গুরুত্ব কমিয়ে দেয় না। বরং এটি দেখায়, ভবিষ্যতের টিকা উন্নয়নের দর্শন বদলে যেতে পারে। একেকটি ভাইরাসের পেছনে দৌড়ানোর পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা এখন ভাইরাস পরিবারের অভিন্ন দুর্বল জায়গাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাইছেন। যদি সেই কৌশল সফল হয়, তাহলে নতুন মহামারি শুরু হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো টিকা প্রয়োগের নতুন পদ্ধতি। প্রচলিত সূঁচের বদলে বিশেষ জেট ইনজেকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকা শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে। সূঁচভীতি অনেক মানুষের টিকা গ্রহণে অনীহার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যতে যদি এই প্রযুক্তি আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে গণটিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষকেরা ইতোমধ্যে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলার মতো রোগের জন্যও সর্বজনীন টিকা তৈরির চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে যেসব ভাইরাস দ্রুত রূপ বদলায় এবং বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্টি করার ঝুঁকি বহন করে, তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—জনবিশ্বাস। কোভিড-১৯ মহামারির সময় এমআরএনএ টিকাকে ঘিরে যেভাবে বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য ছড়িয়েছিল, তা বিশ্বজুড়ে টিকাদান কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এআই-নির্ভর টিকার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়লে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই গবেষণার ফলাফল যেমন স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে এআই এখানে কী করছে এবং কী করছে না।
কেমব্রিজের এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এটি এখনো সম্ভাবনার গল্প, নিশ্চিত সাফল্যের নয়। বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেয় আশাবাদ, কিন্তু তাকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রমাণ। এআই হয়তো ভবিষ্যতের টিকা গবেষণাকে আরও দ্রুত, আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও দক্ষ করে তুলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন রক্ষার সিদ্ধান্ত নেবে তথ্য, পরীক্ষা এবং কঠোর বৈজ্ঞানিক যাচাই—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একা নয়।
ইয়াসেমিন নিকোলা সাকায়ের 


















