ভারতের রাজনীতিতে সংসদ অধিবেশন মানেই উত্তপ্ত বিতর্ক, কৌশলগত সমীকরণ, আইন পাসের হিসাব এবং সংবাদমাধ্যমের অবিরাম রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। কিন্তু একটি গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল কতগুলো বিল পাস হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—রাষ্ট্র কোন মৌলিক প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের ভিত্তি নির্মাণ করছে।
সম্প্রতি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশন সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোর একটিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির প্রতিবাদ নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে নতুন করে ভাবার আহ্বান। যদি এই আন্দোলনের পরিণতি কেবল একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা মন্ত্রিসভার রদবদলে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে একটি গভীর নৈতিক আবেদনকে আমরা আরেকটি স্বল্পস্থায়ী রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত করব।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক জবাবদিহি অবশ্যই অপরিহার্য। কোনো মন্ত্রী ব্যর্থ হলে তার দায় স্বীকার করাও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যেই যদি সংস্কারের সমাপ্তি ঘটে, তবে সমস্যার মূল অক্ষত থেকে যায়। স্থায়ী পরিবর্তন আসে প্রতিষ্ঠানকে বদলানোর মাধ্যমে। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যায়, যাতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, শিক্ষা নীতির মৌলিক লক্ষ্য ও মানদণ্ড অপরিবর্তিত থাকে।
এক সময় ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠীকে বিশ্বের অন্যতম বড় জনমিতিক সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিপুল সংখ্যক তরুণকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশ অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারত। কিন্তু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়লেও সেই সুযোগকে গুণগত উৎকর্ষে রূপান্তর করার কাজ যথেষ্ট সফল হয়নি। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সৃজনশীলতা, গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা সেই অনুপাতে বিকশিত হয়নি।
একটি জনমিতিক সুবিধা তখনই বাস্তব সম্পদে পরিণত হয়, যখন শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের পথ নয়, বরং দক্ষ চিন্তাশীল মানুষ, নৈতিক নেতৃত্ব, উদ্ভাবক, গবেষক, সৎ প্রশাসক, দায়িত্বশীল উদ্যোক্তা এবং মানবিক নাগরিক তৈরির মাধ্যম হয়ে ওঠে। সেই লক্ষ্য পূরণে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে কল্পনা করা ছাড়া বিকল্প নেই।
সবচেয়ে আগে পরিবর্তন আনতে হবে মূল্যায়ন ব্যবস্থায়। যতদিন পরীক্ষা মুখস্থ বিদ্যাকে পুরস্কৃত করবে, ততদিন শ্রেণিকক্ষেও মুখস্থ করানোর প্রবণতাই প্রাধান্য পাবে। কিন্তু যদি মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকে ধারণাগত বোঝাপড়া, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বাস্তব সমস্যার সমাধান, সৃজনশীলতা ও নৈতিক বিচারবোধ, তাহলে শিক্ষার চরিত্রও বদলে যাবে। শিক্ষা কী শেখায়, তার বড় অংশ নির্ধারণ করে পরীক্ষা কী মূল্যায়ন করছে।
একই সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষাকেন্দ্রিক কোচিং সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীলতাও কমাতে হবে। আজ বহু পরিবার বিপুল অর্থ ব্যয় করছে এমন একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থায়, যার লক্ষ্য মূলত পরীক্ষা পাস করা। এর ফলে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা দুর্বল হচ্ছে এবং শৈশব প্রতিযোগিতার চাপে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। স্কুলের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, বহুমাত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা গেলে এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ শিক্ষক। বিশ্বের যেসব দেশ শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জন করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে উচ্চমানের শিক্ষক ছাড়া উন্নত শিক্ষা সম্ভব নয়। শিক্ষকতাকে মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কঠোর প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ এবং নেতৃত্ব তৈরির ব্যবস্থা—এসবকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘদিনের শিক্ষক শূন্যপদ দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পূরণ করাও জরুরি।
![]()
শিক্ষাকে সমাজ ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি গবেষণা, শিল্পক্ষেত্র, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, গ্রামীণ সমাজ, জনসেবা কিংবা বাস্তব প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগই জ্ঞানকে অর্থবহ করে তোলে।
সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থাও পুনর্গঠন করতে হবে। একজন শিশুর শিক্ষার মান তার পারিবারিক আয় বা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। দেশের প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ে ন্যূনতম অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ক্রীড়া সুবিধা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নীতিনির্ধারকেরাও যখন সরকারি শিক্ষার মানের ওপর ব্যক্তিগত আস্থা রাখবেন, তখনই প্রকৃত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর একাডেমিক স্বাধীনতা দিতে হবে। সরকারের কাজ হওয়া উচিত শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা; পাঠদান, গবেষণা ও পাঠ্যক্রমের প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা নয়। সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান স্বাধীন পরিবেশেই বিকশিত হয়।
সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্বচ্ছতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফলাফল, শিক্ষকসংকট, গবেষণা, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ও কর্মসংস্থানের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জনগণ এবং নীতিনির্ধারক উভয়ই বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারবেন। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই কার্যকর সংস্কারের ভিত্তি।
শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। উন্নত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে—বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার এবং নতুন ধারণার বিকাশে ধারাবাহিক অর্থায়ন ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
সবশেষে, শিক্ষা সংস্কারকে নির্বাচনী রাজনীতির উত্থান-পতনের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা নীতির দিকনির্দেশনা পাল্টে গেলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই একটি স্বাধীন, আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে নির্দিষ্ট মানদণ্ড, অগ্রগতির মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক জবাবদিহির ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি।
ভারতের শিক্ষা ভবিষ্যৎ কোনো একক দল, সরকার বা মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। এটি এমন একটি জাতীয় প্রকল্প, যার সাফল্যের ওপর আগামী কয়েক দশকের অর্থনীতি, গণতন্ত্র, উদ্ভাবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে। আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই কে শিক্ষামন্ত্রী থাকবেন, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো—ভারত কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ করতে প্রস্তুত, যা তার আগামী প্রজন্মকে কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চিন্তাশীল, সৃজনশীল এবং দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে?
যদি সোনম ওয়াংচুকের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ সেই বৃহত্তর জাতীয় আত্মসমালোচনার সূচনা করতে পারে, তবে সেটি কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে অনেক বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির পদক্ষেপ নয়, সেই পদক্ষেপকে একটি জাতি কতদূর পরিবর্তনের শক্তিতে রূপ দিতে পেরেছে—সেটিই স্মরণে রাখে।
গীতাঞ্জলি জে. আংমো 



















