রাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবেদনের জেরে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনেছেন। একটি আদালত এক কলামিস্টকে এমন একটি লেখা মুছে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে এক নির্বাচনী প্রার্থীর সঙ্গে অপরাধী চক্রের যোগাযোগের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। আরেক বিচারক একটি সংবাদপত্রকে নির্দেশ দেন, আদালতের নিযুক্ত তদারককারীর অনুমোদন ছাড়া যেন তারা কোনো গভর্নরকে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করে।
গত এক বছরে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা মেক্সিকোতে উদ্বেগজনক এক নতুন প্রবণতার অংশ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তারা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে দেশের আইনকে ব্যবহার করছেন সমালোচক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা এবং হয়রানির অস্ত্র হিসেবে।
বেসামরিক, ফৌজদারি এবং নির্বাচনী আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে। কখনও তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদবিষয়ক আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ, কখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ, আবার কখনও নারী রাজনীতিকদের বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত আইন ব্যবহার করে তাঁদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
মেক্সিকো বহু বছর ধরেই সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক দেশ। ২০০০ সালের পর থেকে সেখানে প্রায় ১৮০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এখন সেই পুরোনো সহিংসতার পাশাপাশি আরেকটি নতুন হুমকি তৈরি হয়েছে—মামলা, আদালতের আদেশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে চাপে রাখা। এটি গুলি বা প্রাণনাশের হুমকির মতো দৃশ্যমান না হলেও, সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে একইভাবে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অনেক সংবাদকর্মী আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-সেন্সরশিপের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর্থিক ক্ষতি, বছরের পর বছর মামলা মোকদ্দমা কিংবা কারাবাসের আশঙ্কায় তারা অনেক বিষয় বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রতিবেদন করা এড়িয়ে চলছেন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্টিকেল ১৯-এর পরিচালক লেওপোলদো মালদোনাদো বলেন,
“আমরা যা দেখছি, তা হলো সরকারি কর্মকর্তারা বিচারব্যবস্থাকেই ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁদের সম্মান, সুনাম বা ভাবমূর্তির ক্ষতি পূরণ করার জন্য নয়; বরং সাংবাদিকদের দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে রেখে ক্লান্ত করে তোলাই এর উদ্দেশ্য।”
অবশ্য এসব আইনের সমর্থকদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের মতে, আইন প্রয়োগ বৈধ এবং প্রয়োজনীয়।
উদাহরণ হিসেবে, মেক্সিকোতে লিঙ্গভিত্তিক রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধের আইনি কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সিনেটর মার্থা লুসিয়া মিচের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন যে নারী রাজনীতিকেরা এসব আইন ব্যবহার করে ভিন্নমত দমন করছেন।
তিনি বলেন,
“এমন এক ধরনের সাংবাদিকতা আছে, যা সত্যিই তার নীতির প্রতি বিশ্বস্ত। কিন্তু আরেক ধরনের সাংবাদিকতাও আছে—সম্মান রেখেই বলছি—যা গভীরভাবে নারীবিদ্বেষী।”
মিচের আরও বলেন, এসব মামলার নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার ব্যাপারে তিনি উন্মুক্ত।
“আমরা এই আইনগুলোর অপব্যবহার করছি না। বরং আমরাই এর ভুক্তভোগী।”
তবে চলতি বছরের শুরুতে আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী ইন্টার আমেরিকান প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্রথমবারের মতো তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সূচকে মেক্সিকোকে ‘উচ্চ মাত্রার বিধিনিষেধ’ (High Restriction) শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে।
সংস্থাটি জানায়, সমালোচনা দমনে সরকারি কর্মকর্তাদের মামলা ও অন্যান্য আইনি উপায় ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
আর্টিকেল ১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ ধরনের ৬৯টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে—যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ এবং আগের বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। অধিকাংশ মামলাই করেছে রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী প্রার্থী বা সরকারি কর্মকর্তা।
একই বছরে সংস্থাটি আরও অন্তত আটটি স্থানীয় ও ফেডারেল আইন শনাক্ত করেছে, যেগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
মেক্সিকোর ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক সংগঠন আরথ্রি-ডি (R3D)-এর নির্বাহী পরিচালক পাউলিনা গুতিয়েরেস বলেন,
“এই আইনি ব্যবস্থাগুলোর প্রকাশ্য অপব্যবহার এখন মেক্সিকোতে বাস্তবতা। আর যেহেতু অনেক আইনই অস্পষ্ট ও দুর্বলভাবে রচিত, তাই বিচারক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এগুলো নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
কর্তৃপক্ষ ও সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘ টানাপোড়েন
মেক্সিকোর সরকার এবং সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। কয়েক দশক ধরে দেশটি যখন একদলীয় শাসনের অধীনে ছিল, তখন বহু সাংবাদিক ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোর পরিবর্তে রাষ্ট্রের সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন। সরকারি অনুদান, বিজ্ঞাপন ও নানা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক সংবাদমাধ্যম সরকারের অনুকূলে অবস্থান নিত।
তবে ১৯৯০-এর দশকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইতিহাসবিদ ও Mexican Watchdogs: The Rise of a Critical Press Since the 1980s বইয়ের লেখক অ্যান্ড্রু প্যাক্সম্যানের ভাষায়, সে সময় মেক্সিকোতে একটি স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমের উত্থান ঘটে।
এই স্বাধীনতা অবশ্য সাংবাদিকদের জন্য নতুন বিপদও নিয়ে আসে। সরকারি দুর্নীতি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সংঘাতে সাংবাদিকরা ক্রমেই মাঝখানে পড়তে থাকেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে তাঁরা যেমন অপরাধী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু হন, তেমনি ক্ষমতাসীনদেরও বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।
একসময় বিভিন্ন সরকার প্রতিবছর সরকারি বিজ্ঞাপনের পেছনে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করত। ফলে বহু সংবাদমাধ্যম আর্থিকভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আটকে দিত, প্রথম পাতার সংবাদ নির্ধারণ করত, এমনকি সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ করলে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভয়ভীতি দেখাত।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেস ওব্রাদর ক্ষমতায় আসার পর সরকারি বিজ্ঞাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি প্রায় প্রতিদিন সকালে সরাসরি সম্প্রচারিত সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন।
এসব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি যেমন নিজের সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতেন এবং দিনের সংবাদ আলোচনার দিক নির্ধারণ করতেন, তেমনি প্রায়ই তাঁর নীতির সমালোচনাকারী বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশকারী সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে আক্রমণ করতেন। তাঁদের উপহাস করতেন, বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতেন, এমনকি অনেক সময় তাঁদের ব্যক্তিগত আয়-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি নিয়মিতই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন এবং দাবি করেন, তাঁর দল মোরেনা কোনো ধরনের সেন্সরশিপ সমর্থন করে না।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি বলেন,
“যদি কোনো সাংবাদিক অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে অন্য যেকোনো নাগরিকের মতোই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি তাঁর দলের যেসব নেতা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন, তাঁদেরও প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন। মে মাসে তিনি এমন একটি বড় সংবাদমাধ্যম বয়কটের আহ্বান জানান, যেটি তাঁর দাবি অনুযায়ী কর পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেছে।
এ নিয়ে সমালোচনা উঠলে শেইনবাউম বলেন,
“এটি সেন্সরশিপ নয়, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত। আমি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো টেলিভিশন চ্যানেলকে বন্ধ করার চেষ্টা করছি না।”
তবে সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করে, তখন তা অন্য রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদেরও আইনি প্রতিশোধ নেওয়ার সাহস জোগায়।
ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু প্যাক্সম্যানের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়েন স্থানীয় বা ছোট সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা। বড় প্রতিষ্ঠানের মতো তাঁদের কাছে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানোর অর্থ বা প্রভাব—কোনোটিই থাকে না। ফলে মামলা, জরিমানা বা আদালতের আদেশই অনেক সময় তাঁদের চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
সেন্সরশিপের নতুন অস্ত্র
ঘটনার শুরু মাত্র এক মিনিটের একটি ব্যঙ্গাত্মক অডিও নাটিকা দিয়ে।
স্থানীয় কমিউনিটি রেডিও রেডিও তেওসেলো একটি ছোট্ট ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান প্রচার করে। সেখানে তিন ভাইবোন তাঁদের প্রভাবশালী বাবার কাছে আসন্ন ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁদের জন্য মনোনয়ন কিনে দেওয়ার অনুরোধ করছে। কে কোন দলের হয়ে নির্বাচন করবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে হাস্যরসাত্মক তর্কও চলে।
পুরো অনুষ্ঠানটিতে কোনো ব্যক্তির নাম, কোনো রাজনৈতিক দলের নাম কিংবা কোনো এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তবু মারা চামা ভিয়া, যিনি মেক্সিকোর ইকোলজিস্ট গ্রিন পার্টির হয়ে ওই অঞ্চলের কংগ্রেস সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন, মনে করেন এই অনুষ্ঠানটি তাঁকেই লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। তাঁর বাবা আগে তেওসেলো শহরের মেয়র ছিলেন।
তিনি শুধু রেডিও তেওসেলোর বিরুদ্ধেই নয়, বরং অতীতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন করা অন্য কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করেন।
আদালতে দাখিল করা নথিতে তাঁর অভিযোগ ছিল, এসব সংবাদে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে ছোট করে দেখানো হয়েছে এবং তাঁর নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে একটি ফেডারেল আদালত পাঁচজন সাংবাদিককে “লিঙ্গভিত্তিক রাজনৈতিক সহিংসতার” জন্য দোষী সাব্যস্ত করে।
রায়ে বলা হয়, তাঁরা মারা চামা ভিয়াকে একজন প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিকের অধীনস্থ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে খাটো করেছেন।
চামা ভিয়া নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব না দিলেও বলেন,
“এই মামলাটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যার মুখোমুখি রাজনীতিতে থাকা বহু নারী আজও হন।”
আদালতের শাস্তিও ছিল কঠোর। সাংবাদিকদের এক মাসের বেতনের বেশি অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়, ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান এবং অভিযোগে উল্লেখ করা সব প্রতিবেদন মুছে ফেলতে হয়। পাশাপাশি তাঁদের নাম জাতীয় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অপরাধী নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন প্রতিবাদ জানালে মামলাটি দ্রুত জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭০ জন ব্যক্তি এই বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।
রেডিও তেওসেলোর প্রতিবেদক ও ওই ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানের রচয়িতা এলফেগো রিভেরোস বলেন,
“মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা তথ্য জানার অধিকার নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনো মূল্যই থাকছে না। ক্ষমতাবানদের দিকে আঙুল তুললেই তারা প্রতিশোধ নিতে শুরু করে।”
সমালোচকই শুধু নন, টার্গেটে অন্যরাও
এই ধরনের আইনি পদক্ষেপের শিকার শুধু সাংবাদিকরাই নন।
চলতি বছরের শুরুতে দুর্নীতিবিরোধী কর্মী মিগুয়েল আলফোনসো মেজা-কেও একটি আদালত লিঙ্গভিত্তিক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁর অপরাধ ছিল বিচারক পদপ্রার্থী সিলভিয়া দেলগাদোকে “নার্কো আইনজীবী” বলে উল্লেখ করা।
দেলগাদো একসময় বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত মাদক সম্রাট হোয়াকিন গুজমান লোয়েরার—যিনি “এল চাপো” নামে পরিচিত—আইনজীবী ছিলেন। মেক্সিকোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় নির্বাচনে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়েই মেজা এই মন্তব্য করেছিলেন।
পরবর্তীতে আদালত মেজার বিরুদ্ধে আরোপিত কিছু শাস্তি প্রত্যাহার করলেও দেলগাদো জানান, তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আপিল করবেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“আমার উদ্দেশ্য কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়; আমি আমার মর্যাদার জন্য লড়ছি।”
তিনি আরও বলেন,
“আমার প্রার্থিতাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করা এবং আমাকে মাদক পাচারের অভিযোগে তদন্ত হওয়া অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে তিনি আমার বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরঞ্জিত আক্রমণ চালিয়েছেন।”
“সেই ভয় এখনও আমাকে ছাড়েনি”
গত বছরের বড়দিনের আগের রাতে বন্দরনগরী কোয়াতসাকোয়ালকোস-এর অপরাধবিষয়ক সাংবাদিক রাফায়েল লেওন মনে করেছিলেন, তাঁকে অপহরণ করা হচ্ছে।
কোনো পরিচয়বিহীন কয়েকটি গাড়ি তাঁর পথ আটকে দেয়। সশস্ত্র লোকজন তাঁকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে নিয়ে যায়।
কিন্তু সেটি অপহরণ ছিল না—তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল।
ভেরাক্রুজ অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলিরা তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনেন। তাঁদের দাবি, মাদক কার্টেল নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি নিয়মিত পুলিশের আগেই অপরাধস্থলে পৌঁছে যেতেন এবং মাদক চক্রের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতেন।
পরে প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম প্রকাশ্যে এই মামলার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
তবে ভেরাক্রুজের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
লেওন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি প্রায় এক মাস গৃহবন্দি ছিলেন। সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ প্রত্যাহার হলেও অন্য কয়েকটি মামলা এখনও চলমান। সেই কারণে আগের মতো আর নিয়মিত অপরাধসংক্রান্ত খবর সংগ্রহে বের হন না তিনি।
তিনি বলেন,
“সেই ভয় এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি। মানুষও সেটা বুঝতে পারে। তারা বলে, আমি আর আগের মতো নেই।”
মামলা দিয়েই সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলাগুলো এতটাই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হয় যে অনেক সংবাদমাধ্যম শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালাতেই হিমশিম খেয়ে যায়।
এর একটি বড় উদাহরণ কাম্পেচে ট্রিবিউন।
একসময় কাম্পেচে অঙ্গরাজ্যে মুদ্রিত যে পাঁচটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো, ট্রিবিউন ছিল তাদের একটি। কিন্তু সরকারের আর্থিক ও আইনি চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি মুদ্রিত সংস্করণ বন্ধ করে শুধু ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ শুরু করতে বাধ্য হয়।
পত্রিকাটির সাবেক পরিচালক হোর্হে লুইস গনসালেস বলেন,
“গভর্নর তাঁদের বিরুদ্ধে কর নিরীক্ষা চালিয়েছেন, কর্মীদের হয়রানি করেছেন, একের পর এক মামলা করেছেন এবং সব সরকারি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।”
গভর্নর লাইদা সানসোরেস-এর মুখপাত্র ভালথের পাত্রোন, যিনি নিজেও গনসালেসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন, সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানান।
গত গ্রীষ্মে একটি আদালত গনসালেসকে গভর্নর সানসোরেসকে নিয়ে কোনো লেখা প্রকাশ করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
শুধু তাই নয়, কাম্পেচে ট্রিবিউন-কে নির্দেশ দেওয়া হয়, গভর্নরকে উল্লেখ করে প্রকাশিত হতে যাওয়া প্রতিটি সংবাদ আগে আদালতের নিযুক্ত একজন তদারককারীর কাছে জমা দিতে হবে এবং তাঁর অনুমোদন পাওয়ার পরই তা প্রকাশ করা যাবে।
তবে সাংবাদিকদের আইনজীবীরা আদালতে স্থগিতাদেশ (ইনজাংশন) পাওয়ায় ওই নির্দেশ কার্যকর হয়নি।
একই সময়ে প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার অভিযোগ উড়িয়ে দেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন,
“মেক্সিকোতে সেন্সরশিপ কোথায়? এখানে সবাই যা খুশি বলতে পারে, এবং কাউকে তার জন্য নিপীড়নের শিকার হতে হয় না।”
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন, সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষক এবং বহু সাংবাদিকের মতে, বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁদের দাবি, আজকের মেক্সিকোতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় হুমকি শুধু সহিংসতা নয়, বরং আইনকেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। মামলা, আদালতের আদেশ এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এখন এমন এক নীরব সেন্সরশিপে পরিণত হয়েছে, যা সাংবাদিকদের গুলি না করেও তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে পারে।
: এমিলিয়ানো রদ্রিগেজ মেগা ও পাউলিনা ভিয়েগাস 




















